ভাষা আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা
শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ১২:২৪:২২

প্রকাশিত : শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ ০১:৩৯:৩০ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ভাষা আন্দোলনে সংবাদপত্রের ভূমিকা

ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধিকার চেতনার প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ সোপান। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে পূর্ববাংলার সংবাদপত্রের ভূমিকাও ছিল গুরুত্ববহ। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকায় প্রধান দুটি দৈনিক পত্রিকা ছিল দৈনিক আজাদ ও মর্নিং নিউজ। এই দুটি পত্রিকাই ছিল সরকারি দল মুসলিম লীগের সমর্থক। ফলে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনকে পত্রিকা দুটি সমর্থন দেয়নি মোটেই। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, পরে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা করা প্রসঙ্গে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছাত্র প্রতিনিধিদের চুক্তির খবর এই দুটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে বটে কিন্তু তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি। ১৯৪৯, ৫০, ৫১ সালের বিভিন্ন সময়ে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে মিছিল সমাবেশ বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের খবর এ দুটি পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়নি। তবে এ সব খবর গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয় ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায়। 

প্রথম থেকেই ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন দেয় দৈনিক ইত্তেহাদ। কিন্তু পত্রিকাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো। ভাষা আন্দোলনকে সমর্থনের কারণে পাকিস্তান সরকার এটির ঢাকায় আসা নিষিদ্ধ করে। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনকে শক্তিশালী সমর্থন দেয় সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নওবেলাল। ঢাকা থেকে প্রকাশিত তমুদ্দুন মজলিসের পত্রিকা সাপ্তাহিক সৈনিক এবং চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক সীমান্ত পত্রিকা ভাষা আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন দেয়। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সাপ্তাহিক সৈনিকের প্রথম পাতা দেখলেই পত্রিকাটির ভূমিকা বোঝা যাবে। ২৩ ফেব্রুয়ারি সৈনিকের শিরোনাম ছিল ‘শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’- সাবহেড ছিল ‘মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলীবর্ষণ’, ‘বৃহস্পতিবারেই ৭ জন নিহত : ৩ শতাধিক আহত : ৬২ জন গ্রেপ্তার’, ‘শুক্রবারেও বহুসংখ্যক লোক হতাহত’, ‘রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার শপথ বিঘোষিত।’ এই পত্রিকায় আহত আন্দোলনকারীদের জন্য রক্তদানের আহ্বান জানানো হয়।

১৯৫২ সালে ঢাকায় ৩টি বাংলা দৈনিক পত্রিকা ছিল। আজাদ, সংবাদ ও মিল্লাত নামে এ তিনটি সংবাদপত্রই ছিল মুসলিম লীগের সমর্থক। সে কারণে ভাষা আন্দোলনের খবর তারা খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেনি। তবে একুশের গুলিবর্ষণের পর এবং ২২ ফেব্রুয়ারিতেও গণআন্দোলন চলমান থাকায় ও গুলিবর্ষণ চলায় আজাদ ও মিল্লাত পত্রিকা ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন জানায়। যদিও মওলানা আকরম খাঁর পত্রিকা আজাদে শহীদ রফিকের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহের ছবিটি ছাপা হয়নি। আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন একুশে ফেব্রুয়ারির হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যপদে ইস্তফা দেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের সংবাদ পত্রিকা ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিল। সে সময় সংবাদ ছিল পুরোপুরি সরকারের ধামাধরা পত্রিকা। সংবাদ একুশের গুলিবর্ষণের খবর প্রকাশ করে বেশ ছোট আকারে।

ইত্তেফাক সে সময় সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। তবে ইত্তেফাক প্রথম থেকেই ভাষা আন্দোলনকে জোরালো সমর্থন জানিয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলকারীরা ঢাকায় গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে বিশাল মিছিল ও জনবিক্ষোভ করেন। সেদিন রাতে নুরুল আমিন রেডিওতে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ভারত থেকে আগত হিন্দুরা ধুতি পরে নারায়ণগঞ্জে মিছিল করেছে এবং ‘জয়হিন্দ’ স্লোগান দিয়েছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। নুরুল আমিন পুরো ভাষা আন্দোলনকে ভারতের পঞ্চম বাহিনীর কাজ বলে প্রচারণা চালান। তার সেই বক্তব্যকে মর্নিং নিউজ ও সংবাদ প্রচার করতে থাকে।

একুশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের শিল্পীরা সবার আগে ধর্মঘট করেন। এ সম্পর্কে ২৪ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাক জানায়, ‘পুলিশের গুলী চালনার ফলে কয়েকজন ছাত্র ও পথচারীর মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে রেডিও পাকিস্তানের সমস্ত শিল্পী প্রোগ্রামে যোগদানে বিরত থাকেন।’

সংবাদটি পঠিতঃ ২৮০ বার