কার হাতে থাকবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিয়ন্ত্রণ?
শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ১২:২৭:৩৭

প্রকাশিত : রবিবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৭ ০৫:১৪:৪৮ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

কার হাতে থাকবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নিয়ন্ত্রণ?

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

দেশের মোবাইল ব্যাংকিংসেবা (মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস-এমএফএস) বাংলাদেশ ব্যাংক না টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এ বিষয়টির এখনও কোনো সুরাহা হয়নি। এমএফএস বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মোবাইলফোনভিত্তিক ব্যাংকিং (বিশেষ করে মোবাইল সিম) সেবার নিয়ন্ত্রণ বিটিআরসিও রাখতে চায়।  সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যৌথ নিয়ন্ত্রণে থাকলে এমএফএস সার্ভিসে যেকোনও ধরনের  পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর সচিবালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে বিটিআরসি, মোবাইলফোন অপারেটর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ডট (ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকম)-এর প্রতিনিধি নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে বলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে এনটিএমসি (ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেল)-এর প্রতিনিধিও রাখা যেতে পারে বলে বৈঠকে মন্তব্য করা হয়।  এরপর বিষয়টি চূড়ান্ত করতে আরও একাধিকবার বৈঠকে বসে মোবাইলফোন অপারেটর ও বিটিআরসি।  এ লক্ষ্যে গঠন করা হয় একটি কমিটিও।

উল্লেখ্য, এমএফএস-সেবা দিতে কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হয়। ওই অনুমতি নিয়েই এমএফএস সেবা দিতে পারে সংশ্লিষ্ট অপারেটররা।

দীর্ঘদিন ধরেই সংশ্লিষ্ট মহলে এমএফএস সেবা বিটিআরসির নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়ে দাবি উঠে আছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগও বিষয়টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে গেলেও তা দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সুরাহা হয়নি।

এই বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, ‘এমএফএস সেবায় বিটিআরসির রেগুলেশন দরকার। আমরা বলেছিলাম আমাদের জয়েন্ট রেগুলেশন (যৌথ নিয়ন্ত্রণ) থাকলে সুবিধা হয়। বায়োমেট্রিক সিম বিন্ধন আছে। আমাদের এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) ভেরিফিকেশনের সুবিধা আছে। ফলে কোনো কিছু জারি করতেও আমাদের সুবিধা হবে। এই বিষয়ে আমরা প্রস্তাবনা দিয়ে রেখেছি।

বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘টেলিযোগাযোগ আইন অনুসারে টেলিযোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যেকোনও ধরনের সেবা দিতে হলে বিটিআরসির অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বেলায় সে ধরনের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয় না। মোবাইল ব্যাংকিং লাইসেন্সিংয়ের আওতায় এলে তা দু’টি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে থাকবে। তখন ব্যাংকিং বিষয়গুলো দেখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। টেলিযোগাযোগের বিষয়গুলো দেখবে বিটিআরসি।' তিনি আরও বলেন, মোবাইলফোন অপারেটরদের কোনো একটা অনুমতি তো বিটিআরসি থেকে নিতেই হবে। তা করে মোবাইল ব্যবহার করে ‘মোবাইল ব্যাংকিং সেবা’ দিলে তা হবে টেলিযোগাযোগ নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে মোবাইলফোন অপারেটরগুলো এমএফএস-সেবায় রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলের পরিবর্তে ইউএসএসডি সেশনবেজড চার্জ আরোপ করতে চায়। যদিও সরকার এ বিষয়ে এখনপর্যন্ত  কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেনি। তবে টাকা পাঠাতে গ্রাহকপর্যায়ে কোনো ধরনের খরচ বাড়ার পক্ষে সরকার নেই। এ বিষয়ে মোবাইলফোন অপারেটরগুলোর সংগঠন অ্যামটব গত বছরের ২৬ মে বিটিআরসিতে চিঠি পাঠায়। তখন মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো শঙ্কা প্রকাশ করে অ্যামটবের এই প্রস্তাবনা বিটিআরসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পেলে গ্রাহকের টাকা পাঠাতে খরচ আরও বাড়বে। তবে অ্যামটব বলেছে, গ্রাহকের খরচ বাড়বে না, সবই আগের মতো ঠিক থাকবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আয়ের ৭ ভাগ মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ইউএসএসডি (আনস্ট্রাকচার্ড সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিস ডাটা) চ্যানেল ব্যবহার করার জন্য। এছাড়া আয়ের প্রায় ৮০ ভাগই পায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা এজেন্ট ও পরিবেশক। আর সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (বিকাশ, রকেট, ট্রাস্টমানি, ইউক্যাশ ইত্যাদি) পায় ১৩-১৬ ভাগ। মোবাইলফোন অপারেটররা যে ৭ ভাগ টাকা পায়, তারা সে কমিশনের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে নিতেই প্রস্তাব পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে তারা রেভিনিউ শেয়ারিং মডেলের পরিবর্তে ইউএসএসডি সেশনবেজড চার্জ আরোপ করতে চায়।

এমএফএস সেবায় রেভিনিউ শেয়ারিং মডেল, নাকি পরিবর্তে ইউএসএসডি সেশনবেজড চার্জ আরোপ করা হবে, তা জানতে চাইলে তারানা হালিম বলেন, ‘আমার কথা একটাই, আপনারা (মোবাইলফোন অপারেটররা) যদি আমাকে শতভাগ নিশ্চিত করতে পারেন যে, গ্রাহক-পর্যায়ে কোনো প্রভাব পড়বে না, তাহলে এ রকম প্রস্তাবে আমি রাজি।  আর যদি গ্রাহক পর্যায়ে খরচ বাড়ে, তাহলে সে ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সরকারও রাজি নয়। আমরা বলেছিলাম, আপনি কত টাকা পাঠাচ্ছেন, কয়টা সাকসেসফুল ট্রানজেকশন, আনসাকসেসফুল কয়টা, এসব বোঝার সক্ষমতা ডেভেলপ করেছে কিনা, তা আমাদের দেখতে হবে। গ্রামের একজন মানুষ একবার টাকা পাঠাতে গেলেন। প্রথমবারই তিনি পারলেন। কিন্তু তার সামনে যখন সেশনবেজড হিসাব উপস্থাপন করা হবে, তার এক্সপেরিয়েন্স ভালো নাও হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সামনে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এক রকম হিসাব দেখালো, আবার এমএফএস অপারেটররা একরকম হিসাব দেখালো। আমি তো দ্বৈত হিসাব দেখতে রাজি নই। আমার সরাসরি একটা হিসাব দরকার, আপনি যে হিসাবেই যান না কেন, গ্রাহক-পর্যায়ে গিয়ে এক টাকাও খরচ বাড়তে পারবে না।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সবাই কেবল লাভই করতে চায়, জনগণের সেবা কেউ করতে চায় না। ভবিষ্যতে যেসব এমএফএস অপারেটর আসবে, তারাও লাভ করতে চাইবে। ফলে তারাও তা গ্রাহকের কাছ থেকেই উদ্ধার করতে চাইবে।

সংবাদটি পঠিতঃ ৬৭ বার