হিন্দি ভাষা ও আমাদের টিভি নাটকের পরকীয়া শিক্ষা!
শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ১২:২৬:০১

প্রকাশিত : সোমবার, ২৭ জুলাই ২০১৫ ০৩:৫৭:২৪ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

হিন্দি ভাষা ও আমাদের টিভি নাটকের পরকীয়া শিক্ষা!

আমার দুই ভাতিজি মাঝে-মধ্যেই হিন্দিতে কথা বলে। আমি হিন্দি ভালো বুঝি না। মূলত বোঝার চেষ্টা করি না। ভাতিজিরা টুইন। বয়স পাঁচ। টিভি সিরিয়ালের সংস্পর্শে এখন তারা রীতিমতো হিন্দির ভক্ত। শুধু ভক্ত নয় ‘শক্ত’ ভক্ত।

আমাদের টিভি নাটকগুলোতে ধীরে হলেও প্রবেশ করছে হিন্দি। এবার ঈদে বিভিন্ন চ্যানেলের বেশ কয়েকটি নাটকে দেখেছি বাংলার সাথে হিন্দির মিশেল ব্যবহার। অনেকে বলবেন অসুবিধা কী? আপাত দৃষ্টিতে কিছুই না। যেহেতু ইংরেজি আগে থেকেই মিশে আছে, এখন হিন্দি মিশলে ক্ষতি বৃদ্ধি কী হবে?

আ-মরি বাঙলা ভাষা। আমার ভাষা। আর ইংরেজিটা হলো ব্যবহারিক ভাষা। সারা পৃথিবীর মানুষের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। বলতে পারেন বাণিজ্যিক ভাষা। রুটি রুজির সাথে এর প্রয়োজন। বলা যায় ইংরেজি পেটের তাগিদে। আর বাঙলা প্রাণের তাগিদে। এর মাঝে হিন্দি’র জায়গা কোথায়?

আমাদের নাটকে অনুপ্রবেশকৃত হিন্দির কাহিনী বলি। ভারতে প্রথমে হিন্দি বলে কোনো ভাষার অস্তিত্বই ছিল না। আমাদের বাঙলার সৃষ্টি যখন হয়েছে তখন হিন্দি মাতৃগর্ভেও নয়।

সপ্তদশ শতাব্দীতেও হিন্দি নামে কোনো ভাষা ছিল না। মূলত হিন্দি ভাষার উৎপত্তি ও ব্যাকরণে আবদ্ধ করার কাজ করেন ইংরেজ শাসকরা। তখন ভারতে বিশেষ করে উত্তর ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল পারসিক, সংস্কৃত ও উর্দু।

ইংরেজ শাসকরা এবং বিশেষ করে ফোর্ট উইলিয়ামের ছাত্র তথা ইংরেজ যুবকদের সাথে ভারতবর্ষের ভাষাগত যোগাযোগের জন্যই ব্যাকরণবদ্ধ করা হয় হিন্দিকে।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান জেমস গিলখ্রিস্ট ছয় আদি ভাষার সমন্বয়ে সৃষ্ট হিন্দি ভাষাকে ব্যাকরণবদ্ধভাবে গড়ে তোলার কাজে লালুজী লাল, পন্ডিত সদল মিশ্র প্রমুখ খ্যাত পন্ডিতদের নিয়োগ করেন।

হিন্দির সেই ছয় আদি ভাষা হলো- ব্রজ, অবধি, পাহাড়ি, মাড়োয়ারি, পাঞ্জারি এবং বিহারি ভাষা পরিবার।
তখনকার ভারতীয় অভিজাতরা মূলত কথা বলতেন পারসিক, সংস্কৃত ও উর্দুতে। তারা এই তিন ভাষাকে অভিজাতদের ভাষা হিসাবে আখ্যায়িত করে নবসৃষ্ট হিন্দিকে আখ্যায়িত করেছিলেন বাজারে ক্রেতা বিক্রেতাদের ভাষা হিসাবে।

এটা আমার কথা নয়। লালা লাজপত রাই তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, ‘তিনি যখন আর্য সমাজে দীক্ষা নিয়ে হিন্দির প্রচার শুরু করেন তখন তার পিতা ক্ষুব্ধ হযে বলেছিলেন যে, উর্দু হলো শরিফ বা গণ্যমান্যদের ভাষা আর হিন্দি হলো বাজারের বা ক্রেতা বিক্রেতার ভাষা।’

সুতরাং আমার পাঁচ বছরের ভাতিজির মতো যারা মাঝে মধ্যেই হিন্দি বলে থাকেন, তারা ‘পাঁচ’ বছরেই থেকে যাবেন সারা জীবন এমন ভাবলে ভাবনাটি কি খুব বেশি হাস্যকর হবে?

এবার ঈদের নাটক নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। একটি চ্যানেলে রাতে প্রচারিত এক নাটকে দেখলাম তিন বান্ধবী কক্সবাজারে গিয়েছে, দেখা তিন বন্ধুর সাথে। সেখানে হাফপ্যান্ট, থ্রি কোয়ার্টার পড়ে নানা কেচ্ছার পর দু’জোড়ার প্রেম। আরেক বান্ধবীর আগের প্রেমিক এসে হাজির। কিন্তু বান্ধবীর চোখে এখন নতুন প্রেমিকের অবয়ব। অতএব পুরানো আউট নতুন ইন। বাহ কি চমৎকার!

আরেকটিতে স্ত্রী তার স্বামীকে ভালোবাসে। কিন্তু স্ত্রীর ফেসবুক ফ্রেন্ড এসে হাজির। স্বামীর কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততার অজুহাতে ফেসবুক ফ্রেন্ড ক্রমশ প্রেমিকে পরিণত। আহা পরকীয়ার কি শিক্ষা!

কী বলেন, এই তো আমাদের সংস্কৃতি? নাকি? মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ ‘না’ দুটোই বলা যায়। তবে যারা বোঝেন সম্ভবত তারা উল্টো দিকেই মাথা ঝাঁকাবেন। কারণ মূলত এটা আমাদের সংস্কৃতি নয়। আকাশ আগ্রাসনের ফসল এই বাঁদরামো।

আমাদের দেশে এক সময় ধর্মীয়, সামাজিক এবং পারিবারিক তো বটেই শিক্ষাগুলো শৈশবেই এমনভাবে মগজে গেঁথে দেয়া হতো যে, পরিপূর্ণ বয়সেও বেতাল কিছু করতে অনেক মানসিক বাধার সম্মুখীন হতে হতো। এখন তো ‘আমরা সবাই রাজা’ এখন তো ‘everything is possible’...

কাকন রেজা: সাংবাদিক

সংবাদটি পঠিতঃ ৫৯৮ বার


ট্যাগ নিউজ