রাজনীতির দাবা খেলা
শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ১২:২৬:১৪

প্রকাশিত : শনিবার, ০২ মে ২০১৫ ০৩:০৬:০০ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

রাজনীতির দাবা খেলা

ঈঙ্গমার বার্গম্যানের ‘দ্য সেভেন্থ সিল’ এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ - দুটো ছবিই শুরু হয় দাবা খেলাকে কেন্দ্র করে। দুটো ছবিতেই দাবা শুধুমাত্র প্রধান চরিত্র হয়ে আর্বিভূত হয়না, মানুষের জীবনটাই যে একটা দাবা খেলা সেভাবেও জীবনকে প্রতিফলিত করে। সমস্ত জীবন মানুষকে যেন দাবা খেলা খেলে যেতে হয়। এই দাবা শুধুমাত্র একটা নিরীহ খেলা নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে রাজনীতি, অর্থনীতি, জীবন আর মৃত্যু। সেভেন্থ সিলে আ্যান্টোনিও ব্লক মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলে, শতরঞ্জ কে খিলাড়ীতে, মির্যা সাজ্জাদ আলি বনাম মীর রোশন আলি এবং অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ বনাম ইংরেজ জেনারেল উট্রাম - এই দ্বিমুখী দাবা খেলা চলে। দুটো ছবিতেই খেলায় হারজিত থাকে। তবে সেই হারজিতের চরিত্রের মাঝে বিশাল ব্যবধান। বিশ্ব রাজনীতির মাঠে পশ্চিম সব সময় পূর্বকে পরাজিত করে এসেছে। কাজেই শতরঞ্জ আর সেভেন্থ সিলের দাবা খেলা একরকম হয়না। সেভেন্থ সিলে আ্যান্টোনিও মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলে ঈশ্বরের অনুসন্ধান ও তার প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্যে এবং তার মৃত্যুকে স্থগিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে। সে জানে মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু তবু সে মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলায় মত্ত হয় জীবন জিজ্ঞাসার অজস্র প্রশ্নের উত্তর জানার আকাঙ্খায়। ঈশ্বরের সন্ধান তার পাওয়া চাই চা-ই। কিন্তু শতরঞ্জে কোনো ঈশ্বর নেই,নেই মৃত্যুও। আছে শুধু কুটিল রাজনীতি। একটা পাতলা শতরঞ্জির উপর দিনের পর দিন মির্যা সাজ্জাদ আলি আর মীর রোশন আলি দাবা খেলা খেলে চলেন। সেভেন্থ সিলের আ্যান্টোনিও মৃত্যুর সঙ্গে যে দাবা খেলাটা খেলে তা একান্তভাবেই ব্যক্তিগত। প্রতিটি মানুষ সারাজীবন ধরে, মৃত্যু অবধারিত জেনেও, এই খেলা খেলে, তাদের মৃত্যুকে স্তগিত করার জন্যে। কিন্তু শতরঞ্জির উপর দাবার গুটি ফেলে মির্যা আর মীর যে খেলা খেলে, তা বড় ভয়ানক। এই খেলায় একবার হেরে গেলে জীবনভর গোলামীর খাতায় নাম লেখাতে হয়। খেলা শেষ হয় কিন্তু গোলামী শেষ হয়না। আর তাই সত্যজিতের অন্যান্য ছবির চাইতে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ একটা ভিন্ন মাত্রার গুরুত্ব বহন করে। মির্যা এবং মীরের প্রতীকী দাবার খেলার মধ্যে দিয়ে একটা দেশের ইতিহাসের বিশাল পরিবর্তনের কথা সত্যজিৎ রায় আমাদের দেখিয়ে দেন তার এই ছবিতে। ২ মে তার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে, তার অন্যতম অনবদ্য এই ছবির মাধ্যমে তাকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

সাহিত্য থেকে চিত্রনাট্যে রূপান্তরের সময় সত্যজিত রায় তার ছবিগুলো শুধু পরিবর্তনই করতেন না, পরিবর্ধনও করতেন। ফলে বিভিন্ন ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় কেন্দ্রে চলে আসতে দেখা যায়, যেমন - পরশপাথরে আমরা পাই অর্থনীতি, চারুলতায় প্রেম, অশনি সংকেতে দুর্ভিক্ষ, জয় বাবা ফেলুনাথে হত্যাকান্ড, গণশত্রুতে দুনীর্তি এবং হিরক রাজার দেশে ও শতরঞ্জ কে খিলাড়ীতে আমরা পাই রাজনীতি। মুন্সি প্রেমচাঁদের মূল গল্প ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ তে দেখা যায়, দুজন দাবা খেলোয়াড় ঝগড়া করে পরস্পরকে মেরে ফেলে। ছবির চিত্রনাট্যের সময় সত্যজিৎ রায় এই মৃত্যুর ঘটনাকে ছোট্ট পরিসরে আবদ্ধ না রেখে, সেটাকে আরো বৃহত্তর পরিমন্ডলে নিয়ে, একটা দেশের স্বাধীনতার মৃত্যুর ঘটনার বিশাল ক্যানভাসে নিয়ে যান। ছবিতে তাই মির্যা এবং মীরের শতরঞ্জিতে পাতা দাবা খেলার সমান্তরালে অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ এবং জেনারেল উট্রামের রাজনীতির বাস্তব দাবা খেলা দেখতে পাই। এবং বলাই বাহুল্য সাধারণ দাবা খেলা থেকে রাজনৈতিক দাবা খেলাটি ছবিতে অধিকতর ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছবির শেষের অংশের তুলনায় ছবির প্রথম অংশটি বেশি আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। ছবির প্রথম অংশেই ভারত উপমহাদেশের অস্তমিত সূর্যের পরাধীনতার শেষ চিহ্নটি পরিচালক তার নিপূণ হাতের তুলিতে এঁকে দেন।

ছবির সময়কাল ১৮৫৬ সালের জানুয়ারি মাস, স্থান লক্ষ্মৌ। অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের একশ বছর অতিক্রান্ত এবং সিপাহী বিপ্লবের আগের বছর। ইংরেজ কর্তৃক সমগ্র ভারত দখল সম্পন্ন হয়ে গেছে, শুধু কিছু কিছু এলাকা তখনও নবাব দ্বারা শাসিত হচ্ছে, তাও ইংরেজকে কর প্রদানের মাধ্যমে। প্রথম দৃশ্যের প্রথম সংলাপেই, মির্যা সাজ্জাদ আলি দাবা খেলার শুরুতে মীর রোশন আলিকে বলছে, ‘কিস্তি’। অর্থাৎ মীর রোশন আলিকে রাজা সামলাতে হবে, রাজা শেষ তো খেলা শেষ। ঠিক তার পরের দৃশ্যেই ধারাভাষ্যের মাধ্যমে আমরা পরিচিত হই অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলির সঙ্গে। যিনি তার রাজ্য শাসনের চাইতে বেশি ভালোবাসেন তার রাজ-মুকুট। যে মুকুট ১৮৫১ সালে লন্ডনের একটা একজিবিশানে পাঠানো হয়েছিলো। সেটাই বোধহয় কাল হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তীতে। কেননা, তারপরেই আমরা উট্রামকে দেখি লর্ড ডালহৌসির একটা চিঠি পড়তে যেখানে সেই মুকুট একজিবিশানে পাঠানোর জন্যে খুব প্রশংসা করা হয়েছে নবাবকে এবং সেই সঙ্গে একটা ভয়াবহ বাক্য জুড়ে দেয়া হয়েছে - ‘আরো একটা চেরি ফল খাদ্য হিসেবে আমাদের (ইংরেজ) মুখে পড়বে একদিন’। পরিচালক সত্যজিত রায় অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে সেই চেরি ফলের অর্থাৎ ইংরেজ কর্তৃক একের পর এক রাজ্য গ্রাস করার এক চমৎকার ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়ে যান, কার্টুনের মধ্যে দিয়ে। যেখানে দেখা যায় পাশাপাশি সাজানো পাঞ্জাব, বার্মা, নাগপুর, ঝাঁসি নামক চেরি ফলগুলো টপাটপ টপাপট করে এক ইংরেজ মুখে পুরছে আর গিলে নিচ্ছে, শেষে একটা মাত্র চেরি পড়ে থাকে আর তা হলো ‘অযোধ্যা’- যে চেরিটা গিলতে বাকি আছে।

ইংরেজ এমন এক জাতি যে, বন্ধুত্ব থাকলেও তাকে শেষ করে, আর শক্র হলে তো কথাই নেই। অযোধ্যার নবাব ছিলেন এই শেষোক্ত দলের, অর্থাৎ ইংরেজের সঙ্গে তার কোনো বনিবনা ছিলোনা। ইংরেজের প্রতি তার এতোটা ঘৃণা ছিলো যে তাদের কোনো চিকিৎসক দিয়ে তিনি চিকিৎসা করাতেন না। কাজেই অযোধ্যার পূর্ণ দখল এখন চাই। লর্ড ডালহৌসি কোলকাতা থেকে তাই এই ভার দিয়েছেন জেনারেল উট্রামকে। উট্রাম যদিও খুবই বিরক্ত এসব দখলদারিত্বের প্রশ্নে, কিন্তু চাকরির খাতিরে তাকে সেই কাজ করতেই হবে। ছবির তৃতীয় দৃশ্যে এসে আমরা ইংরেজের চোখ দিয়ে ভারতের মোগল বাদশাদের দৃষ্টিভঙ্গী দেখতে পাই।

জেনারেল উট্রাম বিভিন্ন প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে চিকিসৎক জোসেফ ফেরারের কাছ থেকে নবাব ওয়াজেদ আলির চারিত্রিক বর্ণনা এবং অযোধ্যার শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জেনে নিচ্ছেন। যেমন, নবাব ওয়াজেদ আলির শাসন ব্যবস্থায় কোনো মনোযোগ নেই, সারা দিনরাত সে নাচ-গান, কবিতা, ঘুড়ি ওড়ানো, প্রায় ৪০০ বাঈজি আর ২৯ জন মুতা বউ নিয়ে পড়ে থাকে। আবার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়ে। দেশের মানুষজন কেবল মোরগ লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, ছাগল খেলা ইত্যাদি নিয়ে মেতে থাকে, আর কোনো কাজ করেনা। উট্রমের যুক্তি, যে রাজ্যে এই ধরণের অরাজকতা চলে সেই রাজ্যের নবাব শাসন করার কোনো অধিকার রাখেনা। বাস্তবে সেই সময়ে অযোধ্যায় যথেষ্ট শান্তি বিরাজ করছিলো। নবাবের বিরুদ্ধে কারো কোনো অভিযোগ ছিলোনা। কিন্তু যেহেতু জোরপূর্বক সেই রাজ্য দখল করতে হবে সেহেতু উট্রাম একটা অযুহাত খুঁজছিলো কীভাবে তা দখলে আনা যায়। রাজ্য কেউ সহজে অন্যের হাতে বিশেষত বিদেশি দখলদারের হাতে ছেড়ে দিতে চায় না, নবাব ওয়াজে আলিও ব্যতিক্রম ছিলেন না। উট্রামের শুধু একটা ভয়ই ছিলো, বিনা রক্তপাতে যদি অযোধ্যা বিজয় না ঘটে তাহলে উট্রামকে বাধ্য হয়ে নবাবের সিপাইদের উপর গুলি চালাতে হবে। সেই গুলি চালাবে উট্রামের বাহিনী। সমস্যা হলো, দুই পক্ষের সিপাই ভাই ভাই অর্থাৎ ভারতীয়। কেননা ততদিনে ইংরেজ সারা ভারতবর্ষ দখল করে নিয়েছে এবং সেখানকার সিপাই দিয়েই দেশ চালানো হচ্ছে। কিন্তু যাই হোক না কেনো, উট্রামকে অযোধ্যা দখল করতেই হবে। আর তখনই আমরা বুঝতে পারি, কীভাবে নবাব ওয়াজেদ আলি শা’র সাদা রাজা কত অন্যায় ভাবে লর্ড ডালহৌসির লাল মন্ত্রীর কিস্তির মুখে পড়েছে - কিস্তি পড়েছে উট্রামের মতো একজন দ্বিধাগ্রস্ত জেনারেলের চালে। ছবি যত এগিয়ে যায়, ইংরেজ বাহিনী এগিয়ে আসতে থাকে। অন্যদিকে দুই দাবাড়– মির্যা এবং মীর একটা গ্রামে যখন শেষ খেলার জন্যে যায়, সেখানে দেখে পুরো গ্রাম উজাড় হয়ে গেছে ইংরেজ বাহিনী আসার ভয়ে। একটা মাত্র কিশোর শুধু ইংরেজ বাহিনীকে দেখার অপেক্ষায় সেখানে থেকে যায়। পুরো ছবিতে এই ছোট্ট কিশোরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র। কেননা, এই চরিত্রটি আমাদের এটাই ইঙ্গিত করে, জোরপূর্বক কেউ ভূমি দখল করলেও, কিছু না কিছু মানুষ থাকে যারা প্রতিবাদ করে এবং নিজের অধিকার নিজে ছিনিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়।

ইংরেজের আগমনের মধ্যে দিয়ে ছবি শেষ হলেও, ছেলেটির কথা আমরা ভুলতে পারিনা। আমরা উপলব্ধি করি, নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ’র মতো সহজ-সরল উদাসীন শাসক দিয়ে দেশে শান্তি বিরাজ করলেও, শেষ রক্ষা করা যায়না। রাজনৈতিক দাবা খেলায় রাজনীতিবিদদের তাই সদা সচেতন থাকতে হয়। না হলে, দেশের বাইরের আবহ ঠিক ঠাক দেখালেও, গভীরে চলতে থাকে ক্ষয়। দাসত্বের ক্ষয়। যে ক্ষয় বিদেশি দখলদারিত্ব উঠে গেলেও, দেশীয় দখলদারিত্বের আদলে থেকে যায়। সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনা আর। স্বাধীন হয়েও পরাধীনতার শৃঙ্খল পরে থাকতে ভালোবাসে। শতরঞ্জির উপর যেমন অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে দাবার গুটি চালতে হয়, একটা দেশের রাজনীতির দাবার চালও ঠিক সেভাবে সতর্কতার সঙ্গে চালতে হয়। না হলে, অধিকাংশ সময়েই পা ফসকে যাবার আশংকা থাকে। যে আশংকা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে আজও তাড়া করে।।

সংবাদটি পঠিতঃ ৬৮৭ বার


ট্যাগ নিউজ