ট্যানারি শ্রমিকদের চোখেমুখে অন্ধকার, মালিকরা লাপাত্তা
শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ০৩:৩৩:২৪

প্রকাশিত : শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৭ ০১:৫৬:২৬ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ট্যানারি শ্রমিকদের চোখেমুখে অন্ধকার, মালিকরা লাপাত্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

রাজধানীর হাজারীবাগের বিভিন্ন ট্যানারিতে কর্মরত শ্রমিকদের পথে বসার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। কারখানার মালিকদের দেখা পাচ্ছেন না তারা। আদালতের নির্দেশে গত ৮ এপ্রিল এখানকার কারখানাগুলোয় সবরকম সেবা সংযোগ (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিফোন) বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর মালিকরা এখন ধরা দিচ্ছেন না শ্রমিকদের কাছে। শ্রমিক ও কারখানা সংশ্লিষ্টদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে কিছুই বলছেন না তারা। এ কারণে শ্রমিকরা অন্ধকার দেখছেন চোখেমুখে। কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে কোথায় কাজ করবেন আর কীভাবে সংসার চলবে সে দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছে তাদের। 

সরকার এবং আদালতের একের পর এক আদেশ-নির্দেশের পরও হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরীতে ট্যানারি সরিয়ে নেওয়া না নেওয়ার বিষয়ে নানান আলোচনা, সমালোচনা এবং ঝক্কিঝামেলায়ও কাজ করেছেন শ্রমিকরা। কারণ তাদের সাহস জুগিয়েছেন মালিকরা। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে কারখানা স্থানান্তরের বিষয়ে বারাবার জানতে চাইলেও মালিক পক্ষ শ্রমিকদের বুঝিয়েছেন, কারখানা এত সহজে সাভারে স্থানান্তর হচ্ছে না। এমন অভিযোগ করেছেন শ্রমিকরা।

ট্যানারি শ্রমিকদের অনেকের দাবি, হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানার মালিকরা তাদের বুঝিয়েছেন ট্যানারি কারখানা হাজারীবাগে চলছে, হাজারীবাগেই চলবে। মালিকদের ভয় ছিল কারখানা স্থানান্তরের বিষয়টি আগেভাগে জানাজানি হয়ে গেলে একদিকে শ্রমিকরা তাদের পাওনা চাইবে, অন্যদিকে কারখানা সংশ্লিষ্ট অন্যরাও তাদের পাওনা বুঝে নিতে চাইবে। পাশাপাশি শ্রমিকরাও মানসিকভাবে সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ার বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি নেবে, এতে এখানে কাজের ব্যাঘাত ঘটবে। এসব কারণেই মালিকরা কারখানার শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিভ্রান্তির মধ্যে রেখেছেন বলে অভিযোগ শ্রমিকদের। 

সোনালি ট্যানারি লিমিটেডের শ্রমিক আবুল বাশার বলেছেন, ‘কারখানায় তো এখন অন্ধকার। সেখানে কোনও লোকজন নেই। দুই দিন ধরে কারখানার গেটও খুলছে না। মালিকদেরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুনেছি তাদের মোবাইল ফোনও বন্ধ। বকেয়া বেতন কবে দেবেন, সাভারে কারখানা কবে স্থানান্তর করবেন, আদৌ করবেন কিনা,  আমরা এখন কি করবো, কিছুই তো জানি না।’ একই হতাশা ব্যক্ত করলেন হাসান ট্যানারি কোম্পানির শ্রমিক বেলায়েত হোসেন, থ্রি স্টার ট্যানারি লিমিটেডের শ্রমিক আকবর হোসেন এবং মদিনা ট্যানারির শ্রমিক শাহ আলম। 

এদিকে শ্রমিকরা এ পর্যন্ত যেসব কারখানায় কাজ করেছেন, সেখানকার বেতনাও পরিশোধ হয়নি। এখনও মার্চ মাসের বেতন পাননি কেউই। পাওনা বকেয়া বেতন পাওয়া যাবে কিনা তা জানেন না তারা। মালিকদের অনুপস্থিতিতে কেউই পরিষ্কার করে কিছু জানাচ্ছেন না। এপ্রিল মাসে তাদের কি হবে তাও জানেন না কেউ।

গত ৯ এপ্রিল সকালে কারখানায় এসে হাজিরা দিয়ে চলে গেছেন অনেক শ্রমিক। কারণ হাজারীবাগের কারখানাগুলো এখন বন্ধ। সাভারেও তৈরি হয়নি নতুন কারখানা। এমন অবস্থায় অনেকেই নতুন কাজের সন্ধানে ছুটছেন সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে। হাজারীবাগ থেকে সাভারের দূরত্ব কম নয়। সেখানে কোথায় থাকবেন, কোথায় উঠবেন কিংবা কাজ করবেন কোথায়, এসব প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে। সবকিছুই এখন তাদের কাছে ঘোলাটে।

এমন অবস্থায় কারখানার মালিকদের সংগঠনের (বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন) পক্ষ থেকে শ্রমিকদের সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন নেতারা বলছেন, বিসিক দায় চাপাচ্ছে মালিকদের ঘাড়ে। ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য সাভার পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। হঠাৎ পরিবেশ অধিদফতর যে লাইনগুলো বিচ্ছিন্ন করেছে তাতে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ হাজার কোটি টাকার বেশি চাওয়া হয়েছে।

গত ১০ এপ্রিল হাজারীবাগে শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে সমাবেশ করেছে মালিক পক্ষ। এতে ৯ দফা দাবি উপস্থাপন করেন তারা। সমাবেশে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেছেন, ‘চামড়া শিল্পের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে। ১৯৯১ সালে তৃতীয় পক্ষ পাট শিল্পকে ধ্বংস করেছিল। আর ২০১৭ সালে এসে চামড়া শিল্পের ক্ষতি করতে উঠেপড়ে লেগেছে একটি পক্ষ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদে শেকড় অনেক গভীরে। আমাদের শ্রমিকরা তাদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত হাজারীবাগের কর্মস্থল ছাড়বে না। আজ আমাদের জলে ডুবিয়েছে বিসিক। তাই বিসিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হলো।

এ প্রসঙ্গে বিসিক চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মুহ. ইফতিখার বলেছেন, ‘ট্যানারি মালিকরাই সাভারে তাদের কারখানা স্থানান্তরের বিষয়ে গড়িমসি করেছেন। কারণে- অকারণে তারা বারবার কালক্ষেপণ করেছেন। এ নিয়ে বিসিকের ওপর দায় চাপানো ঠিক হবে না। সাভার এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। এছাড়া শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে বিসিকের তো কিছু করার নাই। কারখানার শ্রমিকদের বেতন মালিকরা দেবেন, এটাই তো নিয়ম।

মোর্শেদ ট্যানারির শ্রমিক মকবুল হোসেন বললেন, ‘জীবন ও জীবিকার সন্ধানে বরিশালের হিজলা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকার হাজারীবাগে এসেছিলাম ২০০১ সালে। তখন এখানে-সেখানে নানান কাজ করার পর যোগ দিয়েছিলাম এই কারখানায়। এতদিন ভালোই চলছিল। এখন তো কারখানা বন্ধ। শুনেছি সাভারে এই কারখানার নামে প্লট আছে। কিন্তু সেখানে কারখানার মেশিনপত্র নেওয়া হয়নি। ভবনের কাজও শেষ হয়নি।

হাজারীবাগের মদিনা ট্যানারির শ্রমিক মোহাম্মদ সেলিম মিয়া বলেন, ‘নোয়াখালীর পরশুরাম থেকে এসে ২০১১ সালে এই কারখানায় যোগ দিয়েছিলাম। সেটি এখন বন্ধ। আমরা কি করবো? কোথায় যাবো? বকেয়া বেতন কবে পাবো? কোথায় কাজ করবো?

সেলিম মিয়ার মতো শ্রমিকদের এসব প্রশ্নের উত্তরে কিছুই জানাচ্ছেন না তাদের মালিক পক্ষ। জানা গেছে, শ্রমিকদের সঙ্গে মালিক পক্ষের বৈঠক হবে। ওই সভায় সরকারি কর্মকর্তারাও থাকবেন। সেখানেই ফয়সালা হতে পারে শ্রমিকরা তাদের বকেয়া বেতন কবে পাবেন। মালিক পক্ষ তাদের বলেছেন, ‘অপেক্ষা করো। কারখানা তো আর চিরকাল বন্ধ থাকবে না। শ্রমিক ছাড়া কারখানাও চলবে না। তাই কারখানা চালাতে হলে শ্রমিক তো লাগবে।

গ্রেট ইস্টার্ন ট্যানারির শ্রমিক আকরাম হোসেন বলেন, ‘ট্যানারিতে কাজ করে যে টাকা পাই তা দিয়ে আমার সংসার চলে। হেমায়েতপুরের কারখানায় কাজ করতে হলে হাজারীবাগ থেকেই যেতে হবে। চাইলেই তো আর বাসা পাল্টাতে পারবো না। আমার সে সামর্থ্যও নাই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেছেন, ‘চাইলেই যেমন আমরা রাতারাতি সাভারে কারখানা চালু করতে পারবো না। একইভাবে চাইলেই হাজারীবাগের কারখানা থেকে মেশিনপত্র খুলে নিতে পারবো না। কারণ এসব মেশিনপত্র ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছি। এখন এই মেশিনপত্র খুলতে গেলে ব্যাংক বাধা দেবে। সাভারে আমরা যারা প্লট পেয়েছি, তাদের প্লটের জমির দলিল দেওয়া হয়নি। জমির দলিল না পেলে হাজারীবাগ থেকে মেশিনপত্র খুলে সাভারের কারখানায় নিতে পারবো না। সাভারে কারখানা চালু করতে না পারলে শ্রমিকদের কোন কাজে নেবো?

শ্রমিকদের সব পাওনা পরিশোধ করা হবে জানিয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, ‘এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। তবে তার আগে এ বিষয়ে আমরা মালিক-শ্রমিক মিলে যৌথসভা করে সিদ্ধান্ত নেবো। এক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে আরও কিছু সহায়তা চাইবো আমরা।’ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্নের কারণে বিসিকের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক বলেন, ‘হাজারীবাগের ট্যানারিতে ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করে। এই শ্রমিকদের ওপর নির্ভর করছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। আদালতের রায়ে সব সংযোগ বন্ধ করে দেয়ার পর মালিকরা ট্যানারি সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। একসঙ্গে এত কারখানা সাভারে সরিয়ে নেয়া যেমন সম্ভব নয়, একইভাবে এই মুহূর্তে এত শ্রমিককেও কাজে নেওয়া যাবে না। ফলে বেকার হয়ে পড়বেন হাজার হাজার শ্রমিক। হাজারীবাগের বিষয়টি এখন মানবিক বিপর্যয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি কাটিয়ে উঠতে সরকারের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।’

উল্লেখ্য, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কারখানা সরিয়ে নিতে বাধ্য করতে রাজধানীর হাজারীবাগের ছোট-বড় প্রায় ২৫৪টি ট্যানারি ও অন্যান্য চামড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি এবং টেলিফোন সংযোগ গত ৮ এপ্রিল বিচ্ছিন্ন করেছে পরিবেশ অধিদফতর। পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক রইছউল আলম ম-লের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে উপস্থিত ছিলেন পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

পরিবেশ অধিদফতর জানায়, হাজারীবাগ ট্যানারি মোড় থেকে অভিযান শুরু হয়। এ সময় ঢাকা ওয়াসা, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস এবং বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ডেসকো ও ডেসার কর্মকর্তারা নিজ নিজ সংস্থার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। টেলিফোন সংযোগ কাটার পর বিভিন্ন কারখানার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ কেটে দেওয়া হয়।

সংবাদটি পঠিতঃ ২৪০ বার