চাল: হাওরের প্রভাব নাকি ব্যবসায়ীদের কারসাজি
বুধবার ২২ নভেম্বর ২০১৭, ১১:৩০:১৮

প্রকাশিত : শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৭ ০৩:২১:৫০ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

চাল:

হাওরের প্রভাব নাকি ব্যবসায়ীদের কারসাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক: 

নতুন চাল বাজারে আসতে শুরু করেছে। তারপরও কমছে না চালের দাম। গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানেই কেজিতে দাম বেড়েছে পাঁচ থেকে সাত টাকা। ব্যবসায়ীদের ধারণা, হাওর অঞ্চলের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ায় চালের বাজারে এর প্রভাব পড়ছে। চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধির কারণ হিসেবে মিল মালিকদের কারসাজিকেও দায়ী করছেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা।

শুক্রবার রাজধানীর জিগাতলা, নিউমার্কেটসহ বেশ কয়েকটি চালের মার্কেট ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বোরোর নতুন চাল বাজারে ইতিমধ্যে আসতে শুরু করেছে। তবে তা গত বছরের তুলনায় কেজি প্রতি ৯ থেকে ১০ টাকা বেশি দরে সরবরাহ করা হচ্ছে।

চালের দাম কমবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, নতুন চালের সরবরাহ পুরোদমে শুরু হলে দাম কমতে পারে। তবে হাওর অঞ্চলের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ায় চালের বাজারে পড়েছে এবং আরো পড়বে।

এদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে সেই সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তারা বলেন, গত কয়েক মাসে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম বেড়েছে ৮ থেকে ১০ টাকা।

জানা গেছে, ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় গত বছর ২৩ টাকা দরে ধান এবং ৩২ টাকা দরে চাল ক্রয় করে সরকার। একই সঙ্গে সরকার ৯২০ টাকা দর বেঁধে দিলেও কৃষক মৌসুমের শুরুতে বেঁচতে বাধ্য হয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে। আর এই সুযোগটা নিয়ে ধান মজুত করেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।

এদিকে উৎপাদন খরচ মাথায় রেখেই চলতি মৌসুমে ধান ও চালের সরকারি ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার ৭ লাখ টন ধান কিনবে সরকার। প্রতি কেজি ধানের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৪ টাকা। অন্যদিকে ৮ লাখ টন চাল কেনা হবে সরকারিভাবে। এজন্য প্রতি কেজি চালের দাম ৩৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ২২ ও চালে ৩১ টাকা খরচ হয়েছে। উৎপাদন খরচ মাথায় রেখেই সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তারা।
তাদের মতে, এক মণ ধানে চাল হয় ২৬ কেজির বেশি। আর অটোমেটিক মেশিনে হয় ৩০ কেজির কাছাকাছি। এই হিসাবে ৩১ টাকা ক্রয়মূল্য ধরা হলে এক বস্তা (৫০ কেজি) চালের দাম আসে ১ হাজার ৫৫০ টাকা। আর সরকার নির্ধারিত মূল্য ধরা হলে দাম আসে ১ হাজার ৭০০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি চালের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা যাওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তারপরও দাম কেন বাড়ছে, এর কোনো জবাব নেই কারো কাছেই। আবার সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই বাজারে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে চালের দাম। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর প্রতি কেজি মোটা চাল ৩৪-৩৭ টাকায়, চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ৩৬-৩৮ টাকায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি ৩৭-৩৮ টাকায় ও আজ ৩৮-৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

নিউ মার্কেটের চাল বিক্রেতা ইলিয়াস আলী জানান, পাইকারি বাজারে দাম বেশি হওয়ার কারণে খুচরা বাজারে দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর সরকারি হিসাবের সঙ্গে চালের প্রকৃত বাজারদরের পার্থক্য ৫-৮ টাকা।

দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে মূল কলকাঠি নাড়েন মিল মালিকরা। মিল মালিকরা নাকি মাঠ পর্যায় থেকে ধান কিনতে পারছেন না। মালিকরা মৌসুম শেষ হওয়ার অজুহাত দেখাচ্ছেন। ৫০ টাকা কেজিতে চাল কিনলাম। বিক্রি করতে হবে ৫২ টাকায়। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন খরচ। আমাদেরও খুব বেশি লাভ হবে না। কিন্তু আগের চাল দোকানে আছে।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন মোকামে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৪৫-৪৮ টাকায় বিক্রি হলেও এর সঙ্গে পরিবহন খরচ, মজুর, সংরক্ষণ ও স্থানীয় পরিবহন খরচের কারণে দাম বেড়ে যাচ্ছে আরো ৪-৫ টাকা।

তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে ৫০ কেজি ওজনের ৩০০ বস্তা চাল ঢাকায় আনতে ট্রাক ভাড়া পড়ছে ১৫ হাজার টাকা। এতে কেজি প্রতি পরিবহন খরচ পড়ছে ১ টাকা। মজুর, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন ও অন্য খরচের সঙ্গে রাজধানীর ব্যবসায়ীদের মুনাফা যোগ করলে প্রতি কেজি চালের দাম দাঁড়ায় ৫৫ টাকা।

রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে নিম্নমানের নাজিরশাইল চালের বস্তা ২ হাজার ৪৫০ টাকার বদলে ২ হাজার ৫৫০ টাকা হয়েছে। আর খুচরা বাজারে ৫০ টাকার নিম্নমানের নাজিরশাইল ৫৩ টাকা হয়েছে।

এ ছাড়া খুচরা বাজারে স্বর্ণা চাল ৪৪-৪৫ টাকা, পারিজা চাল ৪৪-৪৫ টাকা, উন্নতমানের মিনিকেট ভালো ৫৫-৫৬ টাকা, বি আর আটাশ চাল ৪৩-৪৫ টাকা, উন্নতমানের নাজিরশাইল চাল ৫৬-৫৭ টাকা, বাসমতি চাল ৫৯-৬২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সংবাদটি পঠিতঃ ২৫১ বার