সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮, ০২:৪৪:২৯

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১২ মে ২০১৫ ০৫:৩৯:৫৪ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon


পরীক্ষার ভুল রিপোর্টে সুস্থ মানুষও ক্যান্সারের রোগী!

মাদারীপুর থেকে আসা আজগর আলীর পিত্তথলির পাথর অপসারণের লক্ষ্যে অস্ত্রোপচার করা হয় রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারের পর বায়োপসির জন্য কিছু টিস্যু পাঠানো হয় মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ল্যাবে। পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, রোগী ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্বজনরা দিশাহারা হয়ে ছুটে যায় আরেক চিকিৎসকের কাছে। ওই চিকিৎসক আবার বায়োপসি করাতে বলেন ধানমণ্ডির অন্য একটি ডায়াগনস্টিক ল্যাবে। এবার রিপোর্টে ক্যান্সারের কোনো নমুনা ধরা পড়েনি। রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান।

চানখাঁরপুল এলাকার একটি বেসরকারি প্যাথলজি সেন্টারে রক্ত পরীক্ষায় কামরাঙ্গীরচরের এক গৃহিণীর শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়। এমন রিপোর্টের ভিত্তিতে ওই নারী একদিকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, অন্যদিকে স্বামী-সন্তানরা তাঁকে ভুল বুঝে নানা অপবাদ দিতে থাকে। এমনকি সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার চেষ্টাও করেন তিনি। এ অবস্থায় এক চিকিৎসকের পরামর্শে ওই নারীকে নিয়ে আইসিডিডিআরবি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দফা পরীক্ষা করানো হয়। এবার ওই দুই প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে এইচআইভির কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। পরে স্বাভাবিক হয়ে যায় তাঁর জীবন যাপন। একপর্যায়ে ওই নারীর স্বজনরা প্রথম প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে গিয়ে চড়াও হলে কর্তৃপক্ষ দাবি করে, অসাবধানতাবশত ভুল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল। পরে দুই পক্ষে সমঝোতার মাধ্যমে ঘটনার সমাপ্তি ঘটে।

ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় প্রতিদিনই এমন অসংখ্য ভুল বা ভুয়া রিপোর্টের শিকার হয় রোগীরা, যা একদিকে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে, অন্যদিকে হয়রানি ও অর্থ ব্যয়ের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয় লোকজন। মাঝখান থেকে প্রতারণার সুবাদে অর্থ হাতিয়ে নেয় নামসর্বস্ব সব ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেন্টার। এসব সেন্টারের অনেকগুলো থাকে অবৈধ ও নিম্নমানের।

আবার অনেকগুলো কাগজপত্রে বৈধ বা বাইরে থেকে দেখে মানসম্পন্ন মনে হলেও ভেতরে চলে মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিকদ্রব্য বা নষ্ট ও নিম্নমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে রোগ নির্ণয়। সাধারণ কোনো রোগী বা মানুষের পক্ষে এটা ধরা সম্ভব হয় না। যেমন ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবকাঠামো ও চাকচিক্য দেখে এর মান নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগ কম। কিন্তু সম্প্রতি এক অভিযানে চানখারপুলে ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপাদান মেয়াদোত্তীর্ণ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির অভাবে দিনের পর দিন চলছে এ পরিস্থিতি। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি অনেক হাসপাতাল থেকেও দালালচক্রের মাধ্যমে রোগীদের নিয়ে যাওয়া হয় নামসর্বস্ব ও অবৈধ অনেক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক অনুষদের ডিন ও বিএমডিসির নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, কার্যকর তদারকির অভাবেই ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ল্যাবরেটরি টেস্টের ক্ষেত্রে এমন দুরবস্থা বিরাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের যে কমিটি বা প্রতিষ্ঠানগুলো ল্যাবরেটরি মেডিসিন সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছে, সেগুলোকে আরো দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকায় আসা দরকার।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. সামিউল ইসলাম বলেন, 'লোকবলের অভাবে সব সময় হয়তো যথাযথভাবে নজরদারিতে রাখা সম্ভব হয় না। তবে আমরা মাঝেমধ্যেই গোপনে তথ্য সংগ্রহ করে অভিযানে নামি। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে অভিযোগের মুখেও আমরা অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। পাশাপাশি আমাদের অনুরোধে অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়।'

ওই পরিচালক জানান, গত শনিবার রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি টিম আকস্মিক অভিযানে নামে। এ সময় ওই এলাকার ১৭টি রোগ নির্ণয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটি বাদে অন্য সব কটিরই কোনো না কোনো অনিয়ম ও বেআইনি তৎপরতা ধরা পড়ে। এর মধ্যে ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপাদান মেয়াদোত্তীর্ণ পাওয়া যায়। আবার দুটি প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায় অনুমোদনহীন। কয়েকটিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছিল না। কোনো কোনোটিতে নেই উপযুক্ত চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান বা প্যাথলজিস্ট। অদক্ষ ও ভুয়া জনবল দিয়ে কেউ কেউ চালাচ্ছিল এসব প্রতিষ্ঠান। তাই চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিধি অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লালবাগে আরাফাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহাবুব বলেন, সরকারের পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকার ফলেই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মানুষকে প্রতারিত করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশের সাতটি বিভাগে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবের অনুমোদিত সংখ্যা প্রায় আট হাজার। এসবের মধ্যে ঢাকা বিভাগেই আছে প্রায় চার হাজার, যার বেশির ভাগই রয়েছে ঢাকা মহানগরীতে। বিধি অনুসারে নিয়মিত এগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার কথা। তবে বাস্তবে পরিদর্শন হয় খুবই কম। আবার পরিদর্শনের সময় অনিয়ম ধরা পড়লেও পরে নানা অজুহাতে বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে তারা ছাড়া পেয়ে যায়।

বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাস্তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনের বাইরে আরো বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত ও দক্ষ টেকনোলজিস্ট সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত লোক দিয়ে এসব কাজ চালানো হয়।

সূত্র মতে, সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি পরিদর্শন টিম গাজীপুরে ১৪টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করে প্রায় সব কটিতেই কোনো না কোনো অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পেয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। কিন্তু এক মাস পার হতে না হতেই এর মধ্যে কয়েকটি শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে গেছে।

জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান বলেন, একজন চিকিৎসক রোগীর রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেন। রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন। সেই রিপোর্ট যদি হয় ভুল, তবে ওষুধ ও পরবর্তী সব চিকিৎসাই ভুল হবে- এটাই স্বাভাবিক। এতে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। তাই উচ্চ ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ বা সাধারণ টেকনোলজিস্ট যাঁরাই রোগীর বিভিন্ন দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন, তাঁদের অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ল্যাবরেটরিগুলোর সার্বিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা না গেলে কোনো কাজ হবে না। অনেকক্ষ ক্ষেত্রেই উপযুক্ত অনুমোদন ছাড়া এখানে-সেখানে ল্যাবরেটরি গড়ে ওঠার কথা শোনা যায়। আবার ল্যাবরেটরির অনুমতি নিলেও উপযুক্ত উপকরণ ও জনবল আছে কি না, তা ঠিকভাবে দেখা হয় না। তিনি বলেন, এটা নিশ্চিত করতে কেবল কেন্দ্রীয় পর্যায়েই নয়, জেলা-উপজেলা পর্যায়েও একটি করে কার্যকর মনিটরিং টিম থাকা দরকার।

রাজধানীর শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, মিরপুর, খিলগাঁও, রামপুরা, ধানমণ্ডি, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যেখানে-সেখানে ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো দেখা যায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ভেতরেও নিজস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে।

ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ে গবেষণারত এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি দেখেছেন রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি জেলা শহরের বেশ কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডিগ্রিধারী বায়োকেমিস্ট বা প্যাথলজিস্টদের সিল-স্বাক্ষর দেওয়া প্যাড রেখে দেওয়া হয়। সুযোগ বুঝে ডায়াগনস্টিকের সাধারণ কর্মীরা নিজেদের মনগড়া রিপোর্ট লিখে রোগী বা রোগীর স্বজনদের ধরিয়ে দেন। বিশেষ করে সকালের দিকে চিকিৎসকরা হাসপাতালে নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকেন, তখন আগাম সিল-স্বাক্ষর দেওয়ার রিপোর্ট ফরম ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ডে বিভিন্ন পরীক্ষার তালিকা থাকলেও বাস্তবে সেখানে অনেক পরীক্ষাই হয় না। তাঁরা অন্য কোথাও পরীক্ষা করিয়ে আনেন বা ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে দেন।

ওই গবেষক বলেন, 'অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেসব অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতি থাকা দরকার তা নেই। নামমাত্র যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো দিয়ে কাজ করা হচ্ছে সেখানে। এ ছাড়া বেশির ভাগ চিকিৎসকই কমিশনের মাধ্যমে নিজের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষার জন্য রোগীকে পরামর্শ দেন। এ জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর প্রতিনিধি বা দালাল সার্বক্ষণিক কাজ করে থাকেন। তাঁদের খপ্পরে পড়ে রোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই ভুল চিকিৎসার শিকার হন। এ ছাড়া অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বৈধতা নেই। অনেকে কেবল ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই খুলে বসেছেন ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বেশি বেতন দেওয়ার ভয়ে ভালো ও দক্ষ জনবল নিয়োগ না দিয়ে আনাড়িদের নিয়োগ দেওয়া হয় বলেও ওই গবেষক জানান।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

সংবাদটি পঠিতঃ ১৪০ বার


ট্যাগ নিউজ

সর্বশেষ খবর