পহেলা বৈশাখ বাঙালীর প্রেরণার ক্ষণ ॥ মাহবুব রেজা
শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ০৩:২৩:৫৬

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০১৫ ০৫:৫৮:২৮ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

পহেলা বৈশাখ বাঙালীর প্রেরণার ক্ষণ ॥ মাহবুব রেজা

বাংলা সনের প্রথম প্রবর্তক কে তা নিয়ে অনেক গবেষক ও ইতিহাসবেত্তার মধ্যেই মতান্তর রয়েছে। তবে সম্রাট আকবরই যে বাংলা সনের প্রবর্তক তার বহু নজির পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকেরা এ নিয়ে নানা তত্ত্ব-তালাশ চালিয়ে এর পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণও হাজির করেছেন। গবেষকদের বিশ্লেষণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই এ বিষয়টিকে আরও জোরালো করেছে। একেক দেশে একেক রকমভাবে বর্ষবরণ উদযাপিত হয় এবং তা নিয়েও রয়েছে মজার মজার ইতিহাস। লোকাচার। উৎসব।

লোক গবেষক, প্রাবন্ধিক শামসুজ্জামান খান তার এক লেখায় বাংলা নববর্ষের প্রচলন, সন-তারিখ ও পঞ্জিকা নিয়ে তার দীর্ঘ ৪৩ বছরের গবেষণায় লিখেছেন— ‘বাংলা অঞ্চলের নববর্ষের সঙ্গে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নববর্ষ এবং উৎসবের বিষয় ও ধরনকেও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। তা হলে এই অঞ্চলের নববর্ষ উৎসবের মিল-অমিল এবং আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাসের ঐক্যসূত্রও বোঝা সহজ হবে।

বাংলাদেশে বাংলা সন কে প্রবর্তন করেছিলেন, সে সম্পর্কেই এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত ফয়সালা হয়নি। ঐতিহাসিকেরা এ বিষয়ে খুব তথ্যনিষ্ঠ কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন নি। ওডিশার আধুনিক ঐতিহাসিক কাশীপ্রসাদ জয়সোয়াল সে দেশের এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রথমবারের মতো লেখেন, সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক। এই মতের সমর্থক হিসেবে আমরা পেয়েছি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. মেঘনাথ সাহা, প্রত্নতত্ত্ববিদ অমিতাভ ভট্টাচার্য (দ্য বেঙ্গলি এরা ইন দি ইন্সক্রিপশনস অব লেটার মেডিয়েভল বেঙ্গল, খ- ১৩), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ভূতপূর্ব কারমাইকেল অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন প্রমুখকে। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন পণ্ডিত ঐতিহাসিক-গবেষক বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে নানা রাজা-বাদশাহ বা সুলতানের নাম হাজির করেছেন। কেউ বলেছেন, সম্রাট শশাঙ্ক বাংলা সনের প্রবর্তক। কেউ বা বলেন হোসেন শাহ বা নেপালি সম্রাট সন্রাঙ। তবে খুঁটিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আকবর বা উপর্যুক্ত কারও নামই বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে ঐতিহাসিক প্রমাণে চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করেনি। আনুষঙ্গিক তথ্যপ্রমাণ এবং ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের বিচার-বিবেচনা করে আমরা মোগল সুবেদার (পরবর্তীকালে নবাব) মুর্শিদকুলি খানকেই বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করি। তবে তিনি আকবর-প্রবর্তিত ‘তারিখ-এ-এলাহি’র সূত্র অনুসরণ করেই বাংলা অঞ্চলের কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সন প্রবর্তন করেছেন— এমনই ধারণা করি। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তা হলে সম্রাট আকবর পরোক্ষভাবে এই সনের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন মনে করা যেতে পারে।’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হাজার হাজার বছর ধরে বাংলার জীবনাচার ছিল কৃষিভিত্তিক। মূলত কৃষির ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন। সংগ্রাম। এগিয়ে যাওয়া। দুঃখ-কষ্ট। মোগল সম্রাটরা সুবেদার মুর্শিদকুলি খানের ওপর কর আদায়ের জন্য কঠোর নির্দেশ জারি করেন। কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বাংলায় মোগলদের নির্দেশিত ‘হিজরী সন’ কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে বেশ কষ্টকর ছিল। এর কারণ ছিল প্রতিবছর হিজরী সন সাড়ে ১০ বা ১১ দিন পিছিয়ে যায়। আর এর ফলে খাজনা বা কর আদায়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হতো। সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান একটা বিবেচনায় রেখে সম্রাট আকবর প্রবর্তিত ‘এলাহী সনের’ আদলে বাংলায় হিজরী চান্দ্র এবং ভারতীয় সূর্য-সনের সম্মিলনে বাংলা সন চালু করেন। ঐতিহাসিকেরা অনুমান করছেন প্রাক-মধ্যযুগের মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহাসিক মুন্সী সলিমুল্লাহর ফার্সী ভাষায় লেখা। তারিখ-ই-বাঙলাহ (১৭৬৩) গ্রন্থে এর উল্লেখ আছে। ‘তারিখ-ই-বাঙলাহ’ গ্রন্থে বা হয় নবাব মুর্শিদকুলি খান পহেলা বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব চালু করেন। সে সময় ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতির ছাপ সুস্পষ্ট থাকায় ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠানের আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান হিসেবে চালু করেন ‘হালখাতা’ উৎসব। হালখাতা উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলার মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্যের প্রবাহ তৈরী হয়। ফসল কাটার সময় কৃষকের হাতে নগদ অর্থের সমাগম ঘটত আর তখনই সে সারাবছরের বাকি শোধ করত ব্যবসায়ীকে। বছরের প্রথম দিন ব্যবসায়ীরা হালখাতার উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে সারাবছর ব্যবসা-বাণিজ্যের লক্ষ্মী ধরে রাখতেন।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে একদিনের তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। কেন এই তারতম্য? জানা যায়, বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে মেঘনাদ সাহার বৈজ্ঞানিক সংস্কার পদ্ধতি অনুসরণ করে ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা সনের সংস্কার সাধন করেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর এই সংস্কারের পরে আরও পরিপূর্ণ সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে। উল্লেখ্য, বাংলা দিনপঞ্জির সাথে হিজরী সন ও খ্রীষ্টীয় সনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরী সন পরিচালিত হয় চাঁদের হিসাবে। অন্যদিকে খ্রীষ্টীয় সাল ঘড়ির হিসাবে। এ কারণ হিজরী সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় চাঁদের উদয়ে। আর ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে। পহেলা বৈশাখকে রাত ১২টা থেকে গণনা করা হবে না সূর্যোদয় থেকে গণনা করা হবে তা নিয়ে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে অনেকের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণত সূর্যোদয় থেকে পহেলা বৈশাখ গণনা করার রীতি বজায় থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে বাংলা একাডেমি ১৪০২ বঙ্গাব্দের ও বৈশাখ থেকে এই নিয়ম বাতিল করে।

সম্রাট আকবরের নির্দেশে বাংলা সনের বিভ্রান্তি নিরসনে এগিয়ে আসেন তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজী। ১৫৮৪ খ্রীষ্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে শুরু হয় বাংলা সন গণনা। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলী সন। পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে। আকবরের সময় থেকেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখ উদযাপন। আকবরের সময় প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। খাজনা পরিশোধ হলে প্রজাদের ভূমির মালিকরা নানারকম মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। আপ্যায়নের এই পর্বকে হালখাতা বলা হয়।

প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়াটা খুবই সঙ্গত যে, কবে থেকে আমাদের সমাজে প্রথম পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। ১৯১৭ সালে প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এই রীতিটি চলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকে। ১৯৩৮ সালেও একই ধরনের উদযাপনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এই ধারা কম-বেশী চলতে থাকে। তখন পহেলা বৈশাখের চিরায়ত চেহারাটি সবখানে কম-বেশী প্রত্যক্ষ করা যায়।

এরপর নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রক্রিয়া। দেশভাগের পর পাকিস্তানী শাসকদের বাধার মুখে পড়ে পহেলা বৈশাখ। পাকিস্তানী শাসকরা বাঙালীর এই সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। তারা পহেলা বৈশাখকে নিয়ে নানা বাধা-নিষেধ, উপেক্ষা, অবজ্ঞার মনোভাব প্রকাশ করতে থাকে। কিন্তু পূর্ব বাংলার বাঙালীর প্রবল জাতীয়তাবাদী চেতনা ও দেশপ্রেমের সাথে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় এ ব্যাপারে পাকিস্তানী শাসকদের কোনো বাধা উপেক্ষা কিংবা বিধি-নিষেধ ধোপে টেকেনি। উল্টো বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনা আরও গভীর হতে থাকে। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৬৬ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন তথা বাংলা নববর্ষ বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক চেতনার জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে শুরু হয় বাঙালীর প্রাণের উৎসব। রমনা পাকুড়মূলে নববর্ষ উদযাপনের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ওই সাল থেকে। শুরু থেকে এই উৎসব বাঙালীর চেতনায়, প্রাণে বোধে, মননে এক প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে যায় এবং এরপর থেকে এই অনুষ্ঠান রাজধানী ঢাকা থেকে ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতি, আত্ম-পরিচয়ের ধারক-বাহক হয়ে ওঠে এই নববর্ষ উৎসব। সময়ের বিবর্তনে এই উৎসবে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, এই উৎসব আজ বাঙালীর সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

বাংলা নববর্ষের সাথে বিভিন্ন অঞ্চলের নববর্ষের তারতম্য লক্ষণীয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নববর্ষের অমিল পাওয়া যায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নববর্ষের উৎসব মধ্য এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়। অঞ্চল ভেদে কখনো কখনো তা মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। ‘বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা’ এক সময়ে ঐতিহাসিক কারণে এই তিন অঞ্চলের নাম উচ্চারিত হতো একসাথে। এই তিন অঞ্চলে এখনো একই দিনে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়। এই অঞ্চলে বাংলার নবাবদের পরিপূর্ণ আধিপত্য ছিল। একই সাথে এসব অঞ্চলে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আবহ বিদ্যমান ছিল। এক অঞ্চলের সাথে আরেক অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বন্ধনও ছিল বেশ প্রগাঢ়। অন্যদিকে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দুটি ভারতীয় রাজ মণিপুর ও আসামেও ১৪ এপ্রিল— সময় ভেদে কখনো কখনো ১৫ এপ্রিল নববর্ষ উদযাপিত হয়। নেপালেও একই দিনে উদযাপিত হয় মৈথিলী নববর্ষ। পাঞ্জাবের নানক শাহী শিখেরাও এ উৎসব পালন করে।

প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা ও তার প্রবর্তিত শকাব্দ সনের সংস্কারের কিছু সংস্কার সাধন করে ভারত সরকার পাণ্ডে কমিটির যে সংস্কার প্রস্তাবটি গ্রহণ করে তাকে বৈজ্ঞানিক রীতিনীতির আলোকে পরিষ্কারভাবে ১৪ এপ্রিলে নববর্ষ উযাপন করতে হবে তার নির্দেশ রয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মেঘনাথ সাহা ভারতের যে পঞ্জিকা সংস্কার করেন তাতে ২২ মার্চকে নতুন বছরের ভিত্তি ধরে ওই তারিখের অনুষঙ্গী চৈত্র মাসকেই শকাব্দ পঞ্জিকার নববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জানা যায়, ১৯৫৭ খ্রীষ্টাব্দে মেঘনাথ সাহার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ভারত সরকার। এই কমিটির সুপারিশে চালু হয় ‘শকাব্দ’। এই প্রস্তাব তেমনভাবে গৃহীত হয়নি ভারতের মানুষের মধ্যে। ১৯৬৬ খ্রীষ্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান সরকার বাংলা একাডেমিকে বাংলা ক্যালেন্ডারে সংস্কার করে লিপ-ইয়ারের বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মত করার দায়িত্ব প্রদান করে। এই মর্মে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটির সুপারিশ গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে। এই সুপারিশে বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৩১ দিনে। পরের সাত মাস ৩০ দিনে। যে বছর লিপ-ইয়ার হবে সে বছর ফাল্গুন মাস একদিন বেড়ে ৩১ দিন হবে। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে নববর্ষ একদিন আগে-পিছে উদযাপিত হয়। নববর্ষ উদযাপনের উপমহাদেশের বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের ‘নওরোজ’-এর প্রভাব রয়েছে। মোগলরাই ইরানী ঐতিহ্যের সূত্র ধরে ভারতে নববর্ষ চালু করে। ইরানের এই ‘নওরোজ’ উৎসবের প্রভাব মধ্য এশিয়ার কোনো কোনো অঞ্চলে আজও দেখা যায়। কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলুচিন্তান প্রভৃতি অঞ্চলে এখনো নববর্ষকে নওরোজ নামে চিহ্নিত করা হয়।

১৯৬৫ সালে ছায়ানটের নববর্ষ উদযাপন পরবর্তীকালে দেশ স্বাধীনের পর অর্থাৎ ১৯৭২ সালে (১৩৭৯ সন) সর্বসম্মতভাবে ‘পহেলা বৈশাখ’কে বাংলাদেশের জাতীয় পার্বন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে জাতীয় পর্যায়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হতে থাকে। গ্রাম থেকে নগর, নগর থেকে বহির্বিশ্ব— সর্বত্রই এখন পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধুন্দুমার কর্মযজ্ঞ। পহেলা বৈশাখ তার বিশালতায়, পরিধি দিয়ে বাঙালীর আনন্দ-বেদনা, দুঃখ-কষ্টকে ভুলিয়ে দিয়ে নব আনন্দে জাগ্রত করে। উজ্জীবিত করে। উদ্দীপিত করে।

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রাম-গঞ্জে নানা উৎসব-পার্বণ পালিত হয়। বৈশাখের এ সব উৎসব-পার্বণ মানুষকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করে। একে অন্যের সাথে আত্মীয়তা তৈরী হয়। বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ ছাড়া নানা ধরনের গ্রামীণ মেলায় বাংলার লোকশিল্প পল্লবিত হয়। চোখ জুড়ানো রং-বেরঙের হাঁড়ি-পাতিল খেলনায় ভরে ওঠে মেলা-প্রাঙ্গণ। বৈশাখী মেলার প্রাঞ্জলতা মানুষের হৃদয়কে পরিপূর্ণ করে। এ সব মেলাতে বসে কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর জম্পেস নানা ধরনের পসরা। থাকে নানা রকম পিঠাপুলির আয়োজনও। অনেক জায়গায় ব্যবস্থা থাকে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার আয়োজন। নানা ধরনের খেলাধুলারও আয়োজন করা হয়ে থাকে বৈশাখকে সামনে রেখে। এ সবের মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা ও কুস্তি উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি বসে ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। এটি জব্বারের বলি খেলা নামে বিশেষভাবে পরিচিত। এদিকে ঈশা খাঁর সোনারগাঁয়ে বসে এক ব্যতিক্রমী মেলা, যার নাম বউমেলা। জয়রামপুর গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ১০০ বছর ধরে পহেলা বৈশাখে এই মেলার আয়োজিত হয়ে আসছে। পাঁচ দিনব্যাপী এই মেলাটি বসে প্রাচীন একটি বটগাছের নিচে। যদিও হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা সেখানে সমবেত হয় সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পূজা উপলক্ষে। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাদের মনষ্কামনা পূরণের আশায় এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করে থাকেন। মিষ্টি ও ধান-দূর্বার সাথে মৌসুমী ফল নিবেদন করেন ভক্তরা। এ ছাড়া মেলাকে ঘিরে পাঁঠাবলির রেওয়াজও বেশ পুরনো। তবে কালের বিবর্তনে বদলে যাচ্ছে পুরনো অর্চনার পালা। এখন ভক্তরা কবুতর উড়িয়ে শান্তির বার্তা প্রার্থনা করেন দেবীর কাছে। অন্যদিকে সোনারগাঁ থানার পেরাব গ্রামের পাশে আয়োজন করা হয় ঘোড়ামেলার। এ মেলা নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত আছে, যামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন। তিনি মারা যাওয়ার পর ওই জায়গাতে বানানো হয় তার স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে হিন্দুরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং সেখানে আয়োজন করে মেলার। যার কারণে মেলাটির নাম হয়েছে ঘোড়ামেলা। এ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করা। এরপর সেই খিচুড়ি কলাপাতায় করে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই খায়। একদিনের এই মেলাটি জমে ওঠে মূলত দুপুরের পর থেকে। মেলায় সবচেয়ে বেশী ভিড় লক্ষ্য করা যায় শিশু-কিশোরদের। মেলাতে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে রাখা হয় নাগরদোলা, পুতুলনাচ ও সার্কাসের। এ ছাড়া মেলার ক্লান্তি দূর করতে যোগ হয় কীর্তন গান। খোল-করতাল বাজিয়ে এ গানের আসর চলে অনেক রাত পর্যন্ত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের মধ্যেও নানা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়ে থাকে। পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে পহেলা বৈশাখ নিয়ে আসে ভিন্ন মাত্রা, ভিন্ন আহমেদ। পাহাড়ের ঢালে ঢালে উৎসব-পার্বণের সুর উচ্চারিত হয়। মানুষের মনের অনাবিল আনন্দ পাহাড় বেয়ে ছড়িয়ে পড়ে লোকালয়ে।

বর্ষবরণে চাকমারা তিন দিনব্যাপী উৎসবে মেতে ওঠে। ফুলবিজু হল চাকমাদের বর্ষবরণ উৎসব। চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ ফুলবিজু শুরু— ৩১ চৈত্র হল তার মূল আয়োজন। মারমারা পালন করে সাংগ্রাই উৎসব। এই গোষ্ঠী জীবনের কৃত্যমূলক আচারও এসব উৎসবে চলে আসে। বৈশাখী পূর্ণিমা উদযাপনও নৃ-গোষ্ঠীর ধর্মীয় কৃত্যের সাথে মিশে গেছে। বিজু ও সাংগ্রাই উৎসবে আদিবাসীদের মধ্যে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়। ঐতিহ্যবাহী পিঠা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন, খেলাধুলার আয়োজন, বৌদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধ প্রণাম, ধর্ম উপদেশ প্রার্থনাসহ নানা ধরনের কর্মযজ্ঞে মেতে ওঠে তারা। মারমাদের কাছে বৈশাখ নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মারমারা বিশ্বাস করে, এই বৈশাখে মহামতি গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও বুদ্ধত্বপ্রাপ্তি ঘটেছে। তাই বৈশাখী পূর্ণিমায় তাদের আনন্দ ও নিবেদনের সাড়া জাগে। চাকমা ও মারদের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী পহেলা বৈশাখী উদযাপন করে। চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখের প্রথম দিন এই তিন দিন ত্রিপুরাবাসী বৈসুক উৎসব পালন করে। নতুন রঙিন জামা-কাপড় পরে ত্রিপুরার শিশু, যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ সবাই উৎসবে মেতে ওঠে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী সাধারণত ৩টি পর্বে এই বৈসুক উৎসব পালন করে। এগুলো হল— হারি বৈসুক, বুইসুক্তমা বা বিষুবা ও বিসিকাতাল। বৈসুক উৎসব চলাকালীন তিন দিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মহল্লায় মহল্লায় ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্যের আয়োজন করা হয়। সাঁওতাল, ওরাও, গারো, ম্রো, মোরাং, হাজংসহ নানান আদিবাসীরা তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি অনুযায়ী বৈশাখ উদযাপন করে থাকে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্তমানে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকাংশে। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আয়োজন এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্যই এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ বাংলার অগ্রসর মানুষের সমন্বয় ঘটেছে এই শোভাযাত্রায়। ঢাকার চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা সময়ের ধারাবাহিকতায় এখন মানুষের মনে শক্ত ভিত করে নিয়েছে। কীভাবে শুরু হল এ মঙ্গল শোভাযাত্রা? প্রখ্যাত শিল্পী রফিকুন নবী (রণবী) এক সাক্ষাৎকারে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বলতে গিয়ে জানান, ‘১৯৮৬ সালে যশোরের চারুপীঠের শামীম ও হিরন্ময় চন্দের উদ্যোগে প্রথম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে সাজগোজ করে শোভাযাত্রা বের করা হয়। চারুকলা ইনস্টিটিউটের ও চারুশিল্পী সংসদের উদ্যোগে আমরা ১৯৮৯ সালে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করি। তবে যশোরের চারুপীঠ সংসদের উদ্যোগে আমরা ১৯৮৯ সালে ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করি। তবে যশোরের চারুপীঠ এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবিদার। তাদের চেতনা থেকেই আমরা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রা শুরু করি।’

মঙ্গল শোভাযাত্রায় পাপেট, ঘোড়া, হাতি, বাঘ, ময়ূর, কুমিরসহ নানা ধরনের মুখোশ শোভা পায়। লোক গবেষকরা মনে করছেন, মঙ্গল শোভাযাত্রায় প্রদর্শিত এসব প্রতিমূর্তিগুলো নিছক পশুপাখির অরাব নয়। এসবের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের বাঙালীর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। চলমান রাজনীতি থেকে শুরু করে নানা রকম সঙ্গতি-অসঙ্গতি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ উঠে এসেছে এ সব প্রতীকী মুখোশে। এসবের পাশাপাশি শোভা পায় লক্ষ্মীপেঁচা, সরযচিত্র, বাহারি রঙের নানা উপকরণ।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রক্রিয়ার বহুমাত্রিক বিচিত্রতা, আনুষ্ঠানিকতা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, অবস্থানরত বাঙালীর আত্মপরিচয়ের অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে। বাঙালীর সারাবছরের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নাকে ধুয়ে-মুছে দিতে পহেলা বৈশাখ তার আপনরূপে উদ্ভাসিত হয়। আর এই উদ্ভাসে দেশের মানুষ নতুন প্রাণশক্তিতে জেগে ওঠে। নতুন দিনের প্রত্যাশায় বরণ করে নেয় বছরের প্রথম দিন। নববর্ষকে। পহেলা বৈশাখকে। তাই পহেলা বৈশাখ বাঙালীর প্রেরণার দিন— এগিয়ে যাওয়ার শুভক্ষণ।

সংবাদটি পঠিতঃ ২৩৫ বার


ট্যাগ নিউজ