মঙ্গলবার ২১ নভেম্বর ২০১৭, ০৩:০৯:০১

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০১৫ ০৯:২৫:৪৮ পূর্বাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ফরহাদ মজহার

দর্শনের ভাষা বা বুদ্ধির ভাষায় কথা বলার গুরুত্ব

পাশ্চাত্যে চিন্তা অর্থাৎ দর্শনের বিকাশ একই সঙ্গে খ্রিস্টধর্মের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে ঘটেছে। সেই দিক থেকে ইউরোপীয় চিন্তা ও সভ্যতা আদতে খ্রিস্টীয়- যদিও গ্রিক দর্শনের আশ্রয়ে তার রূপ ও গড়নের বৈশিষ্ট্যও দৃশ্যমান। আধুনিক পাশ্চাত্য চিন্তাকে বিশেষ ভাবে প্রটেস্টান্ট চিন্তা ও সভ্যতারই সেকুলার রূপ বলা যায়। সাধারণভাবে এটাও লক্ষণীয় যে ধর্ম ও দর্শনের যে স্পষ্ট বিভাজন আমরা পাশ্চাত্যে দেখি, পাশ্চাত্যের বাইরে ইসলাম কিম্বা অন্যান্য অ-খ্রিস্টীয় বা অ-ইউরোপীয় সমাজে আমরা তা দেখি না। কিন্তু পাশ্চাত্যে ধর্মের পর্যালোচনার ধারা কিভাবে গড়ে উঠেছে এবং কিভাবে ধর্ম ও দর্শনের পার্থক্য সংক্রান্ত তর্ক এখনো জারি রয়েছে সে সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল না থাকলে এই পার্থক্যের তাৎপর্য বোঝা যাবে না। বিশেষত এই পার্থক্য কি নিছকই বাইরের রূপ, নাকি তার মর্মগত পার্থক্যও রয়েছে?- এই প্রশ্নেরও মীমাংসা হবে না। ইসলামি চিন্তাবিদরা কেন দর্শনকে সন্দেহ ও সংশয়ের চোখে দেখেন সেটা অনুধাবন করাও কঠিন হবে।

মুশকিল হচ্ছে এই বিষয়গুলো আলোচনার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির দরকার বাংলাদেশে সেই ক্ষেত্রে প্রকট অভাব রয়েছে। ইসলামকে নতুনভাবে পাঠ করবার কিছু সূত্র আমরা আদৌ পাই কি না সেই আশায় এখানে পাশ্চাত্য চিন্তার মধ্যে ধর্ম পর্যালোচনার তর্ককে বোঝার চেষ্টা করেছি। ঘোরা পথে- অর্থাৎ পাশ্চাত্য চিন্তার পর্যালোচনার সূত্র ধরে করবার কারণ হচ্ছে, ধর্ম ও দর্শনের সম্পর্ক বিচারের তর্ক পাশ্চাত্য দর্শনে যেভাবে হয়েছে অন্যত্র তেমন দেখা যায় না। এই বিতর্ক থেকে ‘চিন্তার নিজের স্বরূপে’ অর্থাৎ দর্শনের ভাষায় ইসলাম নিয়ে কথা বলার সুবিধা ছাড়াও আমাদের আর কিছু শিক্ষণীয় আছে কি না সেটা পরিশেষে দর্শনের আলোকে ইসলাম প্রসঙ্গে কিছু প্রাথমিক প্রস্তাবনায় বোঝা যাবে।

চিন্তার স্বরূপ কথাটা জর্মন দার্শনিক গেঅর্গ ভিলহেল্ম ফ্রিডরিখ (১৭৭০-১৮৩১) মহাশয়ের। তাঁর দাবি ছিল এই যে ধর্ম ও দর্শনের বিষয় একই, পার্থক্য শুধু বিষয় উপস্থাপনের আঙ্গিকে (form) বা প্রকাশের রূপে। সেই দিক থেকে ধর্মের পর্যালোচনার অর্থ ধর্মের সত্যকে দর্শনের সত্য হিসাবে প্রকাশ করা। কিম্বা দর্শনের ভাষায় উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যে ধর্মের সত্য নিছকই বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত উপলব্ধি নয়, বরং দর্শনের মতোই সর্বজনীন (necessary)। বলা বাহুল্য, হেগেল এ কারণে দর্শনকে ধর্ম কিম্বা ধর্মকে দর্শনে পরিণত করেছেন বলে নিন্দিত হয়েছিলেন। পাশ্চাত্য দার্শনিকদের মধ্যে হেগেলের প্রতি আমাদের বাড়তি আগ্রহ এই নিন্দার কারণে। তাঁকে বুঝতে পারলে পাশ্চাত্যে ধর্ম ও দর্শনের ভেদ ও অভেদের তর্ক আমরা ধরতে পারব। এটাও বুঝব পাশ্চাত্য এনলাইটমেন্ট বা তথাকথিত ‘আলোকিত যুগ’-এর কেচ্ছা কিভাবে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠির বিশ্বাস, উপলব্ধি, সংস্কৃতি ও জীবন যাপনের ভেতর থেকে উপলব্ধ সত্যকে স্বীকার করে না। বিশেষত তাদের ধর্ম, দ্বীন ও ঈমান-আকিদার লড়াইয়ের সত্যকে অস্বীকার করে। এটা শুধু ইসলামের ক্ষেত্রেই সত্য নয়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠির অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কেও সমান সত্য। ইসলামের প্রতি আমাদের বিশেষ আগ্রহ এ কারণে যে বাংলাদেশে ইসলাম নিছকই বিশ্বাস, ধর্ম বা দার্শনিক চিন্তার মামলা নয়- সরাসরি রাজনীতিরও প্রশ্ন। এর সঙ্গে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে বিশ্বসভায় টিকে থাকা না থাকার প্রশ্ন জড়িত।

ধর্মের পর্যালোচনার অর্থ ধর্মের দার্শনিক বিচার। দর্শন বলতে আমরা কি বুঝি সে সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা শুরুতে আমরা দিয়ে রাখতে পারি। এই ক্ষেত্রে দর্শন সম্পর্কে হেগেলের ধারণা আমরা টুকে রাখছি। হেগেল তাঁর লজিক বইয়ের শুরুতে লিখছেন, ‘অন্যান্য বিজ্ঞানের যে আরাম সেই সুবিধা ভোগ দর্শনের ভাগ্যে নাই। ওদের মতো কোন কিছুর অস্তিত্ব চেতনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রেখে দর্শন স্বীকার করে নিতে পারে না। এমনকি ধরে নিতে পারে না তাদের জানার পদ্ধতিও ইতোমধ্যেই গৃহীত হয়ে গিয়েছে। বিষয়কে জানার শুরু কিভাবে হোল সেটা যেমন গৃহীত হয়েছে ধরে নিতে পারে না, তেমনি সিদ্ধান্তও না।’ (দেখুন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত উইলিয়াম ওয়ালেসের অনুবাদ Hegel's Logic (১৯৭৫)।

অন্যান্য বিজ্ঞান বা শাস্ত্রের সঙ্গে দর্শনের ফারাক আছে। দর্শন ছাড়া অন্যান্য শাস্ত্র তাদের জ্ঞানচর্চার বিষয় সম্পর্কে আগে থাকতেই অনুমান করতে পারে, কিম্বা কি বিষয় নিয়ে তাদের কারবার সেটা জানে; যে বিষয় নিয়ে তারা ভাবতে চায় বা চর্চা করে সেই বিষয় কোন বিশেষ প্রয়াস ছাড়াই নির্দিষ্ট করতে পারে, বিষয় নিয়ে তাদের ভাবতে হয় না। তাদের চেতনা স্বাভাবিকভাবে সেই বিষয়ের অস্তিত্ব বা উপস্থিতি স্বীকার করে নিয়ে সেখান থেকে শুরু করতে পারে। কিন্তু দর্শনের এই সুবিধাটুকু নাই। বোটানি বা উদ্ভিদবিদ্যা জানে তার চর্চার বিষয় হচ্ছে উদ্ভিদ বা গাছপালা, পদার্থবিজ্ঞান পদার্থ বা বস্তুজগৎ; রসায়ন শাস্ত্র কারবার করে রাসায়নিক ব্যাপার স্যাপারের, তার জানার বিষয় রসায়নের জগৎ, ইত্যাদি। এভাবে চেতনার স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতির সুবিধা নিয়ে যেভাবে অন্যান্য বিজ্ঞান তাদের চর্চা চালিয়ে যেতে পারে, দর্শনের সেই আরামটুকু না এখানেই শেষ নয়, যেভাবে বা যে পদ্ধতিতে কোন বিষয় সম্পর্কে জানবার প্রক্রিয়ার শুরু বা শেষ- সেই পদ্ধতিকেও দর্শন নির্বিচারে মেনে নিতে পারে না।

হেগেলের ‘লজিক’ শুরু হয়েছে এভাবেই। দর্শনের দিক থেকে বিচার করলে কথাগুলো এমন কোন নতুন কথা না। কিন্তু এর তাৎপর্য ধরা পড়ে এর পরপরই ধর্ম ও দর্শনের মিল ও অমিল সম্পর্কে হেগেলের বক্তব্যে। তিনি বলছেন :
‘এটা ঠিক যে দর্শনের বিষয় সামগ্রিকভাবে বিচার করলে ধর্মেরই বিষয়- উভয় ক্ষেত্রে সেটা হোল, সত্য। কথাটা এই চূড়ান্ত অর্থে যে আল্লাহ এবং একমাত্র আল্লাহই হচ্ছেন সত্য। উভয়েই তাই প্রকৃতি ও মানুষের এই সীমিত জগৎকে পরস্পরের সম্পর্ক এবং তাদের সত্য আল্লাহর সত্যে বিচার করে।’
ধর্ম পর্যালোচনার যে-তাগিদ আমরা বোধ করছি তা হচ্ছে ধর্মের সত্য কোন্ অর্থে দর্শন বা সজীব ও সক্রিয় চিন্তারও সত্য চিন্তার পরিমণ্ডলে তার উপলব্ধি ও বিচার।
চিন্তার নিজের স্বরূপে সত্য প্রকাশ কথাটাকে অনেক সময় সহজে বোঝানোর জন্য বুদ্ধির ভাষায় কথা বলা বা প্রকাশ করা বলা হয়। এর মানে হচ্ছে সত্যমিথ্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নিজের বুদ্ধি- অর্থাৎ নিজের অনুমান, যুক্তি বা প্রমাণের বাইরে অন্য কোন বরাত না দেওয়া। যেমন, কোন সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি বলি কোরানুল কারিম বা হাদিসে এই কথা বলা আছে, তাহলে আমরা কোরান ও হাদিসের বরাতে কথার সত্যতা দাবি করছি। সেই দিক থেকে সত্যের দাবি করা হচ্ছে ধর্মের ভাষায়। হেগেলের দাবি ছিল ধর্মের ভাষায় উপলব্ধির সত্য প্রকাশিত হলেই সেটা মিথ্যা হয়ে যায় না। দর্শন সেই সত্য দর্শনের আঙ্গিকে কিম্বা বুদ্ধির ভাষাতেও প্রকাশ করতে পারে। তাঁর সারা জীবনের সাধনা ছিল প্রটেস্টান্ট খ্রিস্টধর্মের সত্য দর্শনের ভাষায় হাজির করা। যাতে খ্রিস্টীয় সত্যই সকল চিন্তাশীল ও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জন্য সর্বজনীন ও অনিবার্য সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা বিচার করে দেখার চেষ্টা করব এই বিতর্ক পাশ্চাত্যে এখন কোথায় কিভাবে জারি রয়েছে এবং পাশ্চাত্যের বাইরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠি এই বিতর্ক থেকে আদৌ কোন শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে কি না।

দর্শনের দিক থেকে এখানে অনুমান হচ্ছে সত্য আমরা শুধু বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে নির্ণয় করি তা নয়, সত্য একই সঙ্গে উপলব্ধিরও ব্যাপার। কিন্তু সত্যের উপলব্ধি এবং ‘সর্বজনীন’ সত্য হিসাবে তাকে দর্শন বা বুদ্ধির ভাষায় অনেকের কাছে প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা এক কথা নয়। সত্যের উপলব্ধি যথেষ্ট নয়, তাকে সর্বজনীন ও অনিবার্য সত্য হিসাবে হাজির করবার চ্যালেঞ্জ আলাদা। ধর্মের পর্যালোচনার অর্থ হচ্ছে ধর্মের সত্যকে দর্শন বা বুদ্ধির ভাষায় হাজির ও প্রকাশ করা। ধর্মকে শুধু বিশ্বাস, উপলব্ধি- এমনকি সদর্থে স্বজ্ঞা (intuition) জ্ঞান করলেও বুদ্ধির তুলনায় উপলব্ধি হীনাবস্থায় থেকে যায়, যদি না বুদ্ধি অর্থাৎ দর্শন ধর্মের সত্যকে দর্শনেরই নির্ণয় হিসাবে আত্মস্থ না করে। কেউ ধর্মকে দর্শনে কিম্বা দর্শনকে ধর্মে পরিণত করেছেন কি না তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বুদ্ধির সর্দারি মানতে গিয়ে বুদ্ধির তুলনায় উপলব্ধিকে হীন অথবা গৌণ করা, উপলব্ধির সত্যকে অস্বীকার করা হোল কি না, ইত্যাদি। এই অস্বীকৃতির বিরুদ্ধেই হেগেল দাঁড়িয়েছিলেন। এই ক্ষেত্রে তাঁর উৎকণ্ঠা আসলে কী ছিল তা আমাদের বোঝা দরকার।

ধর্মের পর্যালোচনার নগদ ফল হচ্ছে ঈমান ও আকিদার জায়গায় দাঁড়িয়ে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা ও ধ্যানধারণার কথা যখন বলেন তখন তাঁর ধর্মের অনুসারী না হয়েও আমরা যেন তাঁর উপলব্ধির সত্যটুকু গ্রহণ করতে পারি। দর্শন তার বক্তব্যের সিদ্ধতা প্রমাণের জন্য বুদ্ধি বা যুক্তির বরাত মানে। এতে দর্শন উচ্চস্তরের সত্য হয়ে যায় না। সত্যের কোন স্তরভেদ বা উচ্চনীচ ভেদ নাই। বুদ্ধির ভাষায় কথা বলতে পারার মধ্যে কোন আভিজাত্যের গোমর নাই। শুরুর দিকে এতটুকু খেয়াল রাখলেই যথেষ্ট।

মনে রাখা দরকার আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন একই ভাবে রাজনৈতিকও বটে। দার্শনিক কায়দায় সার্বজনীন সত্যের দাবি ও প্রতিষ্ঠা পাশ্চাত্যের ক্ষমতা ও আধিপত্য কায়েম রাখবার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। বুদ্ধির ভাষাকে সর্বজনীন দাবি করারও রাজনীতি আছে। এই দিকগুলো আমরা মনে রাখব। দর্শনে সর্বজনীনতা ও যুক্তি পরম্পরার দাবি বুদ্ধিকে মানুষের অন্য সকল বৃত্তির সর্দারে পরিণত করে। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের বাহ্যিক দাবি হচ্ছে, বুদ্ধির তৎপরতাই সত্য নির্ণয়ের একমাত্র পথ। অর্থাৎ বুদ্ধির ওপরই আমাদের নিরঙ্কুশ বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কিন্তু পাশ্চাত্য বুদ্ধির ওপর নিরঙ্কুশ বিশ্বাসকে সর্বজনীন সত্য আবিষ্কারের পথ হিসাবে কিম্বা সর্বজনীনতা নির্ণয়ের একমাত্র চাবিকাঠি হিসাবে কায়েম করতে পেরেছে কি না সেটা এখনও প্রশ্নসাপেক্ষ রয়ে গিয়েছে। ইন্দ্রিয়োপলব্ধি ও বুদ্ধির মধ্যে যে ফারাক আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন অনুমান করে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। ধর্মের পর্যালোচনার তর্ক আমাদের এই দিকগুলো ধরিয়ে দিতে সক্ষম হবে আশা করি। ফলে ধর্মের পর্যালোচনা থেকে আমাদের লাভ ছাড়া ক্ষতির কিছু নাই।

পর্যালোচনা- অর্থাৎ কোন বিষয়কে সজীব ও সক্রিয় চিন্তার অধীনে আনা- এই পাশ্চাত্য ধারণাকে মেনে নিয়েই শুরুর দিকে আলোচনা করেছি। চিন্তার এই চর্চা মানুষের বুদ্ধির শক্তি ও সীমা উভয় দিক মূল্যায়নের সম্ভাবনা তৈরি করে। ফলে পর্যালোচনা বিরোধিতা করবার কোন যুক্তি নাই। কিন্তু এই চর্চার গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতাকে আমরা যেহেতু ইসলামের দিক থেকে বিচার করবার প্রস্তুতি হিসাবে নিতে চাইছি সে কারণে বলে রাখা যায় যে পর্যালোচনার তাৎপর্য ইসলামের দিক থেকে বুদ্ধির কের্দানি প্রদর্শন নয়, বরং তা এবাদতের ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর অর্থ নিজের বিভিন্ন বৃত্তির চর্চার মধ্য দিয়ে দিব্যসত্তা হিসাবে মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে জাগ্রত ও শক্তিশালী করা। ইসলাম মানুষকে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসাবে অন্য প্রাণিকুল বা সৃষ্টি থেকে আলাদা করে না। এটা ইসলামের কাজ বা পথ হিসাবে গৃহীত না। বরং ইসলামের কাছে মানুষের মহিমা অন্যত্র। মানুষ আল্লাহর খলিফা। আল্লাহর খলিফা হিসাবে কোরানুল কারিমে মানুষের দিব্যসত্তার মহিমা ঘোষণা ও স্বীকার করা দর্শনের দিক থেকে নতুন প্রস্তাবনা। এই প্রস্তাবনার ইঙ্গিত হচ্ছে মানুষের সম্ভাবনা অপার। দেশকালে তার সত্তা সীমিত হলেও দেশকালের সীমার মধ্যে সে আল্লাহর বা অসীমের উপলব্ধি ও প্রতিনিধিত্ব করবার ক্ষমতা রাখে। বুদ্ধিসহ তার সকল বৃত্তি নিয়ে মানুষ জীবন ও জগৎ এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের ধরন নিয়ে ভাবতে ও সেই মোতাবেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্মযোগে সক্ষম। সেভাবেই তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, গায়েবের প্রতিনিধি বলে মানুষই অনুপস্থিতির এবাদত বা গায়েবের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে রাজি হয়। এখানে পাশ্চাত্যের ‘মানুষ’ সংক্রান্ত যাবতীয় ধারণার সঙ্গে ইসলামের মৌলিক পার্থক্য। ধর্মের পর্যালোচনা, আশা করি, এই দিকগুলো বুঝতে আমাদের সহায়ক হবে।

চিন্তার বৈচিত্র্য, দ্বন্দ্ব ও দেশকালপাত্র-ভেদে বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী অবস্থান বা ‘মত’ অস্বাভাবিক নয়। দ্বন্দ্ব বা মতের পার্থক্য মানেই বিপজ্জনক কিছু নয়। বরং দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চিন্তার গতি ও সচলতার প্রক্রিয়া বুঝতে না পেরে কোন অবস্থান বা মতকে নির্বিচারে শাশ্বত ও চিরস্থায়ী গণ্য করাই বিপদের জায়গা। চিন্তাশীলতার বিভিন্ন মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়ে চিন্তা নিজেই কিভাবে নিজের তৈরি দ্বন্দ্ব মীমাংসা করে এবং নিজের ধারাবাহিকতা চিহ্নিত ও নিশ্চিত করে সেটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।

চিন্তা কোন বিমূর্ত ব্যাপার নয়। মানুষই চিন্তা করে। মানুষই সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেই সিদ্ধান্ত সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের মর্ম ও রূপ নির্ণয়ে ভূমিকা রাখে। চিন্তার দ্বন্দ্ব কিম্বা স্ববিরোধিতা মানুষের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব বা সঙ্ঘাত হিসাবে হাজির হয়। বিশেষ বিশেষ দেশকালে চিন্তা কিভাবে কোথায় কোন্ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তার খবর নিয়ে আমরা একটি জনগোষ্ঠির হালহকিকত বুঝতে পারি। তাহলে সেই দ্বন্দ্বের চরিত্র এবং চিন্তার দিক থেকে মীমাংসার ক্ষেত্রগুলো চিন্তার পর্যালোচনা ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। সূত্র-নয়াদিগন্ত

www.facebook.com/farhadmazhar2009

সংবাদটি পঠিতঃ ৫২৪ বার


ট্যাগ নিউজ