ঘরে-বাইরে নিরাপত্তাহীনতায় নারী
শনিবার ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ১২:৩০:০৪

প্রকাশিত : সোমবার, ২৫ মে ২০১৫ ০২:৩৯:২৮ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ঘরে-বাইরে নিরাপত্তাহীনতায় নারী

 দৈনন্দিন কাজে, জীবনের তাগিদে নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে হয়। কিন্তু বাইরে বের হয়ে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে নারীরা।

 

রাস্তায়, যানবাহনে, পার্কে, খোলা মাঠে, মার্কেটেসহ বিভিন্ন জায়গায় শিশু-কিশোরী থেকে বিভিন্ন বয়সের নারী টিটকারি থেকে শুরু করে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ঘরেও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তারা।

 

ফলে ঘরে কিংবা বাইরে কোনো জায়গাতেই নারীরা নিরাপদ বোধ করে না। সঙ্গে অভিভাবক থাকা সত্ত্বেও বখাটে যুবকদের যৌন হামলার শিকার হচ্ছে। বখাটেদের হাত থেকে বাঁচাতে অভিভাবকরা এগিয়ে এলে তারাও হামলার শিকার হচ্ছেন। রাজধানীতে ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

 

গত ২১ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় ২২ বছরের এক গারো তরুণীকে গণধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। ওই তরুণী যমুনা ফিউচার পার্কের একটি শোরুমে বিক্রয় বিভাগে কাজ করেন। বৃহস্পতিবার রাতে কাজ শেষে বাসায় ফিরতে গাড়ির জন্য কুড়িলে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় হঠাৎ পাঁচ দুর্বৃত্ত মাইক্রোবাসে করে এসে জোরপূর্বক তাকে তুলে নিয়ে যায়।

 

এর পরে মাইক্রোবাসেই পালাক্রমে ধর্ষণ করে উত্তরার জসীমউদদীন রোড এলাকায় ফেলে যায়। স্থানীয়দের সহায়তায় সেখান থেকে বাসায় ফেরেন। পরে শুক্রবার এ ঘটনায় ভাটারা থানায় উপস্থিত হয়ে মামলা দায়ের করেন ওই তরুণী।

 

ভাটারা থানার ডিউটি অফিসার এসআই তাপস কুমার রায় তরুণীর বরাত দিয়ে জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে অজ্ঞাত পাঁচ যুবক ওই তরুণীকে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় ওই তরুণী বাদী হয়ে অজ্ঞাত ওই পাঁচজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

 

এদিকে মামলার পর শনিবার ওই তরুণীকে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে পরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।

 

অন্যদিকে গত ২২ মে রাজধানীর গুলিস্তানে এক তরুণীকে লাঞ্চিত করে দুই যুবক। তরুণীর ভাই অভিযোগ করেন লাঞ্ছিতকারীদের একজনকে ধরেছে পুলিশ। তবে অপরজন ধরা না পড়ার কারন হিসেবে পুলিশের গাফিলতিকেও দায়ি করছেন তিনি।

 

তরুণীর ভাই সোয়াত আল হাসান জানান, তার বোন সিটি কলেজে পড়ে। শুক্রবার সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে কোচিং শেষ করে গুলিস্তান হয়ে ডেমরায় নিজ বাসায় যাচ্ছিল। আশিয়ান পরিবহন নামের বাসে যাওয়ার সময় এর ভেতরে দুই যুবক ওই তরুণীকে লাঞ্ছিত করে। এ ঘটনায় পল্টন থানা পুলিশ শুক্রবার প্রথমে মামলা নিতে না চাইলেও পরবর্তীতে বিকেলের দিকে তাদের জোরাজুরিতে মামলা নেয়।

 

গত ১৪ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটি এলাকায় স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির ছাত্রী পড়া ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ করে গলা কেটে হত্যা করে এক যুবক। পয়লা বৈশাখে উৎসবের সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে ভিড়ের মধ্যে দুষ্কৃতকারী একদল যুবকের হাতে লাঞ্ছিত হন কয়েক নারী। এ ছাড়া কয়েকদিন আগে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলে দুই শিশু শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের চেষ্টা করে ক্যান্টিনের দুই কর্মচারী।

 

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণেই নারীদের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের মতে বিচারকাজে দীর্ঘ সূত্রতার কারণে অপরাধীদের মনে বিচার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় দিন দিন নারীর প্রতি হয়রানী বেড়ে চলেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নারী নির্যাতনের ঘটনার তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে এবং ১২০ দিনের মধ্যে মামলার কাজ শেষ করার কথা বলা আছে।

 

সম্প্রতি অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ এর এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শহরে চলাচলকারী ৪৭ দশমিক ৫ ভাগ নারী গণপরিবহন, রাস্তা কিংবা উন্মুক্ত জনবহুল এলাকায় চলাফেরা করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। শহরের ৯৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানিকে সহিংসতা মনে করেন। এ ধরনের হয়রানির শিকার ৮১ শতাংশ নারী পুলিশের সহায়তা নিতেও ভয় পান। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই মনে করেন হয়রানির প্রতিকারের জন্য পুলিশের সাহায্য চাইলে সমস্যা বাড়ে। গবেষণায় অংশ নেয়া নারীদের ৮৮ ভাগই বলেন, তারা পথচারী, পুরুষ-যাত্রী এবং ক্রেতাদের দ্বারা হয়রানির শিকার হন।

 

অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, নারী লাঞ্ছনার ঘটনাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমরা প্রশ্রয় দিচ্ছি, লালন করছি। আমাদের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনেরও প্রশ্রয় পাচ্ছে। আইনকে প্রভাবিত করার এই প্রচেষ্ট বা প্রবণতাকে যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। শাস্তি নিশ্চিত হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

নারীপক্ষ নামে নারী আন্দোলন সংগঠনের সদস্য ফেরদৌস আজীম বলেন, রাজধানীতে একা চলাচল করার সময় সব নারীই এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার অভাবে নারীর ওপর যৌন আক্রমনকারীরা এখন বেপরোয়া। আইনশৃংখলা বাহিনীর সঠিক নজরদারির ঘাটতি, সচেতনতার অভাব, আইন বা নীতির সঠিক বাস্তবায়ন হলে হয়তো এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

 

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত এ অপরাধীদের মনে অপরাধবোধ তৈরি না হবে ততক্ষণ তারা একের পর এক অপরাধ করেই যাবে। আবার এসব ঘটনা পুলিশকে জানাতে চান না ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা। কারন এসব বিষয় জানাতে গেলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য বাদীপক্ষকে চাপ দেওয়া হয়।

 

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, আমাদের পুলিশ প্রশাসন চাইলেই অপরাধীদের চিহ্নিত ও ধরতে পারেন। সদিচ্ছা থাকলে নগরে, শহরে নারীর প্রতি হয়রানি বা সহিংসতা কমানো সম্ভব। সমস্যার প্রকটতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে এজন্য সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বড় পরিসরে সমাধান চাইলে সমাজকে এক হয়ে জনমত তৈরি করতে হবে।

 

মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার নারী বান্ধব। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তবে এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এজন্য সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এবং মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, শিক্ষা সংস্কৃতি, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা যেমন এগিয়েছে। তেমনি অন্যদিকে নারীরা সর্বত্র নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বর্তমান সময়ে যেকোনো বয়সের নারীই নিরাপদ নয়। নারীর এখন অনিরাপদ অস্বাভাবিক পরিবেশে বাস করছে। আমরা যে পুরুষতান্ত্রিকতার মধ্যে বাস করছি এই মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি গারো তরুণী ধর্ষণের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনা এমন সময় ঘটলো যখন নারীরাই সমাজের বিভিন্ন স্তরে ক্ষমতায় রয়েছে। এ ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে আন্তরিকতার সঙ্গে সব রকম চেষ্টা করা হবে। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা এখন সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তাদের সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

 

থানা পুলিশের অবহেলার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় থানাতে অভিযোগ গ্রহণে অবহেলা প্রমাণিত হলে সে বিষয়য়েও তদন্ত করে দেখা হবে।

 

রাজধানীতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, আমরা আমাদের দিক থেকে বলবো যে, অনিরাপত্তাবোধের জায়গা থেকে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে সে বিষয়ে আমাদের তদন্তপ্রক্রিয়া অব্যহত আছে।

 

তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আমাদের চেষ্টা ও আন্তরিকতা দুটোই আছে। আশাকরি কিছু ঘটনার সমাধান আমরা করতে পারবো। অপরাধীদের গ্রেফতার করে বিচারে সোপর্দ করলে আমার বিশ্বাস এ যায়গা থেকে সবাই বেরিয়ে আসতে পারবো। এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা চাই। আমরা নিশ্চই অপরাধীদের সোপর্দ করতে পারবো। -রাইজিংবিডি

সংবাদটি পঠিতঃ ১৯৭ বার


ট্যাগ নিউজ