আজ শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭, ১০:২৮:৫৪

প্রকাশিত : শনিবার, ১৫ এপ্রিল ২০১৭ ০৪:৩৪:২৭ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

এসো হে বৈশাখ

মুক্তবাণী.কম

রোমান কবির: 

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। এসো, এসো, এসো, হে বৈশাখ। সকল না পাওয়ার বেদনাকে ধুয়ে মুছে, আকাশ-বাতাস ও প্রকৃতিকে অগ্নিস্নানে সূচি করে তুলতেই আবার এসেছে পহেলা বৈশাখ। নতুন স্বপ্ন, উদ্যম ও প্রত্যাশার আলোয় রাঙানো নতুন বাংলা বছর। আজ বাংলা বছরের প্রথম দিন। পহেলা বৈশাখ। সন ১৪২৪। বৈশাখের নবপ্রভাতেই বাঙালির তাই কায়মনো প্রার্থনা-যা কিছু ক্লেদাক্ত, গ্লানিময়, যা কিছু জীর্ণ বিশীর্ণ দীর্ণ, যা কিছু পুরনো- তা বৈশাখের রুদ্র দহনে পুড়ে হোক ছাই। গ্রীষ্মের এই তাপস- নিশ্বাস বায়ে পুরনো বছরের সব নিষ্ফল সঞ্চয় উড়ে যাক- দূরে যাক, যাক দূর-দিগন্তে মিলিয়ে। 

আজ রাজধানীসহ সারাদেশের মানুষের ঠিকানা হয়ে উঠবে রমনা বটমূলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বাংলা একাডেমি এলাকা। আর, সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা ও রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হবে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ এবং অসাম্প্রদায়িক ও সম্মৃদ্ধশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দৃপ্ত শপথ। নতুন এই দিনটি মানুষের মনে পুরনো সব ব্যর্থতা ও আবর্জনার জঞ্জাল সরিয়ে নতুন আশা, কর্মোদ্দীপনা, স্বপ্ন, প্রত্যয় ও প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত হওয়ার ডাক দিয়ে যায়। শহর-নগর, গ্রাম-গ্রামান্তর সর্বত্রই বইছে বর্ষবরণের প্রাণোচ্ছ্বল উৎসব-তরঙ্গ। আর এজন্যই গ্রীষ্মের দাবদাহ তুচ্ছ করে, অস্বস্তি উপেক্ষা করে ভোরে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলবে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। কান পাতলেই শোনা যাবে গান, ঢাক ঢোল-বাঁশির শব্দ, শোনা যাবে নাগরদোলার শব্দ, পায়ে পায়ে উত্থিত ধূলিপুঞ্জের মধ্যে মানুষের গুঞ্জরণ-ধ্বনি, নাগরদোলায় ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে ভয় জাগানো কিছু শব্দ, শিশুর কলরব উচ্ছ্বাস। সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে নগরবাসী আজ মহানন্দে খাবে গ্রামবাংলার নিত্যদিনের খাবার পান্তাভাত।

এদিকে, গতকাল বছরের শেষ ঋতু এবং ঋতুরাজ বসন্তের শেষ মাস চৈত্রের শেষদিনে চৈত্র সংক্রান্তি'র নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি বিদায় জানিয়েছে ১৪২৩ এর শেষ সূর্যকে। পান্তা ইলিশ আর মিঠা মন্ডাইয়ের সাথে নাচ, গানে সমগ্র জাতি বরণ করবে বাংলা নববর্ষকে। নতুন সূর্য উদয়ের সাথে সাথে পুরনো বছরের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসাব কষে জাতি আজ থেকে হৃদয়ে বুনবে নতুন আশার বীজ। বর্ষবরণের জন্য প্রস্তুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাাঙ্গণ। গতকাল সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় নতুন বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে ফেলেছেন এ ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। বর্ষবরণের অন্যতম আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। আর এ শোভযাত্রা ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে গত নভেম্বরে। তাই তো শোভাযাত্রা আকর্ষণীয় করার সর্বোচ্চ চেষ্টায় আয়োজকরা।

কাগজের মুখোশ, রংতুলির আঁচরে বিভিন্ন ভাস্কর্য আর কাঠামো রাঙানো হচ্ছে। এ বছর শোভাযাত্রার স্লোগান নির্ধারণ তরা হয়েছে-‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’। প্রতীক হিসেবে থাকবে উজ্জ্বল সূর্যে হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি। যার পেছনে থাকবে আরেকটি কদাকার মুখ। উদ্দেশ্য সব অন্ধকার যেন আসে আলোর দিকে।

আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ১৩টি মোটিফ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি মোটিফ তৈরি হয়েছে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে। যেখানে আছে বাঘ, ঘোড়া, হাঁস, মুরগি, টেবা পুতুল, সমুদ্র বিজয়ের ময়ূরপঙ্খী, যুদ্ধাপরাধীদের কালো হাতের থাবা ইত্যাদি। এছাড়াও দেখা যায় চারুকলার শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছেন মুখোশ, সড়া, পেপার ম্যাশ, ওয়াটার কালার ও কাগজে তৈরি বিভিন্ন ধরনের পাখি। এসবেই ফুটে উঠবে বৈশাখের চিরায়ত রূপ। নববর্ষের প্রথম দিন সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও অন্যান্যবারের মতো আপামর জনতাও অংশ নেবেন বলে আশা করছেন আয়োজকরা।

গ্রাম থেকে শহর, নগর থেকে বন্দর, গলি থেকে রাজপথ, আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ থেকে প্রকৃতির প্রতিটি নৈসর্গিক দৃশ্যেই অবলোকিত হবে বৈশাখ আগমনের উন্মাদনা। শুভ্র বসন আর বৈশাখী সাজে জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে ভালোলাগা আর ভালোবাসার সম্মিলিত সংযোগ এক হৃদয় হরণ করা পরিবেশ বিরাজ করবে সারাদেশের সর্বত্র। 

শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে পহেলা বৈশাখ ১৪২৪কে বরণ করবে। এছাড়া সরকারিভাবেও উদযাপিত হবে বাংলা নববর্ষ।

নববর্ষ উদযাপনের জন্য ঢাকাসহ সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) আজ শুক্রবার (১লা বৈশাখ) ভোর ৫ টা হতে রাত ৯টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রমনা বটমূল ও এর আশেপাশের এলাকায় বিকল্প সড়ক ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানিয়েছে। বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ উপলক্ষে আগামী ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শিশু পার্ক, চারুকলা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমী, দোয়েল চত্বর, শিশু একাডেমী, হাইকোর্ট ও তৎসংলগ্ন এলাকায় প্রচুর জনসমাগম হবে। এসব এলাকায় সুষ্ঠু যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। সংবাদপত্র অফিসও আজ বন্ধ থাকবে। রাতের আঁধার ঠেলে ভোরের রবি যখন উঁকি দেবে ঠিক তখনই শুরু হবে বর্ণাঢ্য বৈশাখী অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রগুলো বের করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। রেডিও-টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। দেশের সব কারাগার, হাসপাতাল ও এতিমখানায় উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। এছাড়া দেশের সব বিভাগীয় শহর, ঢাকা মহানগর, দেশের সকল জেলা ও উপজেলায় পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে নানা বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও গ্রামীণ লোকজ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। 

সংবাদটি পঠিতঃ ২০৬ বার



সর্বশেষ খবর