আজ রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০২:০৩:৩৯

প্রকাশিত : সোমবার, ২৫ মে ২০১৫ ০৩:০০:২০ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

নজরুল-হাফিজ : প্রতিবাদী দুই যোদ্ধা

মুক্তবাণী.কম

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলাদেশের জাতীয় কবি। জন্মের পর থেকেই দুঃখ যার চিরসাথী। জীবন ও জীবিকার তাগিদে রুটির দোকান, লেটোর দলে পালাগান কিংবা সেনাবাহিনীতে যোগদান কোনো কিছুই তাকে কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। কবি নজরুল তার কবিতায় দেশের কথা, দেশপ্রেমের কথা, স্বাধীনতার কথা, পরাধীনতার শৃংখল ভাঙার কথা, নতুন সূর্যোদয়ের কথা বলেছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। স্পষ্ট উচ্চারণে, নির্ভীক শব্দ ব্যঞ্জনায়। কবি নজরুলের সত্তা থেকে কবিতাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। তার জীবন কথা ও যুগপ্রেক্ষিতের বিশ্লেষণে সে কথা বার বার প্রমাণিত হবে। কবিরা দেশ, কাল, ধর্মের ঊর্ধ্বে হয়ে থাকেন। তবে তারা প্রগাঢ় বিশ্বাসে থাকেন অবিচল। আস্থায় দৃঢ়। পথ চলায় অভিজ্ঞ। কবি নজরুলকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। তার শত্রু-মিত্রের অন্ত নেই। কিন্তু কেউ কি তাকে তার স্বাধীনতার চেতনায় প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে? তার কবিসত্তা ও কাব্য চেতনাকে কলুষিত করতে পারবে? আমরা বোধ করি কেউ তার সাহস করবে না। এবং তা পারবেও না। কারণ তার দেশপ্রেম ও সত্যপ্রেম কষ্টিপাথরে পরীক্ষিত। সে জন্য দেশ ও জনতা তাকে জাতীয় কবির মহান আসনে অলংকৃত করে তাকে সম্মানিত করেছে। নিজেরাও সম্মানিত হয়েছে।

হাফিজ ইব্রাহীম (১৮৭১-১৯৩২) মিসরের জাতীয় কবি। স্বাধীনতা, দেশপ্রেম, দেশমাতৃকার ভালোবাসায় ঋদ্ধ এক স্বার্থক কবি। ঘরছাড়া জীবনযাপন দিয়ে শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে আইনজীবী ও সরকারি আমলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কবিসত্তা তার আত্মপরিচয়ে সব থেকে প্রকট হয়। মিসর ও মিসরীয়দের জাগরণে নেতৃত্ব দেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মিসরের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। তবে কবিতার কথা তিনি কখনও ভুলে যাননি। দেশের স্বাধীনতা, জনমানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, দেশমাতৃকার উন্নয়ন, নারীর স্বাধীনতা ও মূল্যায়ন, শিক্ষা-সাহিত্য সংস্কৃতির সম্প্রসারণ ইত্যাদিতে তিনি নিরলস কাজ করে মিসরবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে অমর হয়ে আছেন। স্বজাত্যবোধ ও মিসরের স্বাধীনতায় উচ্চকিত এ মহান ব্যক্তিত্ব দেশের ভিতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত, নন্দিত-নিন্দিত হতে থাকেন। কিন্তু দেশের স্বাধীনতায় নিবেদিত তার পঙক্তিমালাকে স্মরণে রেখেই তাকে জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয়। স্বাধীন মিসরে তার কবিতামালা যথা মূল্যায়িত ও সর্বজন স্বীকৃত। তার সকল কাব্যকর্ম মানব মনের মণিকোঠায় অধিষ্ঠিত।

খ.

মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন। স্বাধীনতা মানুষের আজন্মের পাওনা। স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের জীবন অর্থহীন, নিষ্প্রাণ। কিন্তু মানুষ আত্মস্বার্থ প্রবণতা কিংবা অর্থলিপ্সা ও ক্ষমতালিপ্সার কারণে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ব্যক্তি, জাতি কিংবা দেশের উপর পরাধীনতার শৃংখল আরোপ করে। সৃষ্টির অনবদ্য সৌকর্য মানুষের উপর নির্যাতনের খড়গ উঁচিয়ে ধরে। কদাচার আর অনাচারের পদতলে পিষ্ট হয় মানবতা। আকাশ-বাতাস ভারি হয় নিপীড়িতের আর্তচিৎকার ও রোনাজারিতে। আদি কিংবা অনাদিকালের পৃথিবীর ইতিহাস এ কথার সাক্ষ্য। স্বাধীনতা পাওয়া না পাওয়া, দেওয়া না দেওয়ার প্রশ্নে বার বার জয়ী হয় নির্যাতিতরা। পরাজয়ের স্বাদ ঢোক গিলে হজম করে অত্যাচারীরা। হয়তো সেটি সময়সাপেক্ষ হতে পারে। স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলন কখনই ব্যর্থ হয় না। সাময়িক থমকে দাঁড়াতে পারে। কারণ স্বাধীনতা মানুষের আজন্ম কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নসাধ। এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকে সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। এ আন্দোলনকে শাণিত করে দেশের বিদ্বৎসমাজ। আন্দোলনের ভিত্তি মজবুত করে দেশের গুণীজনরা। কিন্তু আন্দোলনের তীব্রতাকে বহুমাত্রিকতা দান করে দেশের শিল্পীসমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীরা। সকল দেশের কবি-সাহিত্যিকরাই এ ভূমিকা পালন করে থাকে দায়িত্বশীলতার সাথে। পৃথিবীর সকল দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কবি-সাহিত্যিকরা স্বাধীনতার ডঙ্কা বাজিয়েছেন আপন তালে। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন নানাভাবে। বক্তব্য, বিবৃতি, গান রচনা, যাত্রাপালায় অভিনয়, লেখালেখি ইত্যাদির মাধ্যমে। এমন দুই মহান ব্যক্তি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও মিসরের জাতীয় কবি হাফিজ ইব্রাহীম। দেশ, স্বাধীনতা, দেশের উন্নয়নে নিবেদিত তাদের প্রচেষ্টা ও কবিতা নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনার প্রয়াস পাব বহমান এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে।

আর্থ-সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশ ও মিসর প্রায় সমচরিত্রের। মিসরের সমাজ-সামাজিকতা, অর্থনৈতিক অবস্থা বহু পূর্ব থেকেই আমাদের সামাজিকতার সাথে অনেকটা মানানসই। আদি সভ্যতার পাদপিঠ হবার কারণে ও সুয়েজ খালের অবস্থানের কারণে বহির্বিশ্ব কখনই তাদের দৃষ্টি মিসর থেকে ফেরাতে পারেনি। বরং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সবসময় সেদিকে লোলুপ দৃষ্টি দিয়েছে। মিসরকে তাদের কলোনি বানাতে চেয়েছে। কখনও ফ্রান্স, কখনও বৃটেন তাদের নগ্ন আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত করেছে মিসরকে। কিন্তু স্বাধীনচেতা মিসর এক মুহূর্তের জন্যও তাদের পরাধীনতাকে মেনে নেয়নি। এ জন্য তাদের অনেক রক্ত ও ত্যাগের নজরানা পেশ করতে হয়েছে। তাদের স্বাধীনতা চেতনাকে অব্যাহত রাখতে এবং এ আত্মদান মহীয়ান করতে যারা দুর্বার লিখনী চালিয়েছেন কবি হাফিজ ইব্রাহীম তাদের প্রধানতম।

অন্যদিকে বাংলার খনিজ সম্পদ, অপরূপ সৌন্দর্য, জনমানুষের কোমলতা বরাবরই বিদেশীদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি অনেকটা সহজেই আমাদের দেশে তাদের উপনিবেশ কায়েম করেছেন। দীর্ঘ উপনিবেশিকতা থেকে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা ১৯৪৭-এ একবার স্বাধীনতা লাভ করি। পাঁচ বছরের মাথায় ভাষার দাবিতে এক অনন্য আত্মদানের বিনিময়ে ভাষার স্বাধীনতা লাভ করি। পরবর্তী দুই দশকের মাথায় আবারও পাকিস্তানি শাসকদের হাত থেকে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে আমরা নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা অর্জন করি। এ স্বাধীনতা অর্জনের পশ্চাতে অসংখ্য মানুষের পরিশ্রম, চেষ্টা, সাধনা রয়েছে। রয়েছে কবি-সাহিত্যিকদের স্বাধীনতার চেতনা উদ্রেককারী লেখনীর ভূমিকা। লেখনী, বক্তৃতা, অভিনয় ত্রিমাত্রিক অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে যারা স্বাধীনতার বীজ অংকুরোদগম ও পরিণত শস্যে রূপ দিয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাদের অন্যতম ও প্রধানতম।

গ.

আমরা বাংলাদেশ ও মিসরের দুই জাতীয় কবিকে আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট করেছি। কারণ তারা দু’জনই ছিলেন বৃটিশ নির্যাতনের নির্মম সাক্ষী। তাদের পরাধীনতার যাতনাও এক ধরনের। তাদের বেড়ে উঠা ও সাহিত্য চর্চার গতি প্রকৃতিও একই পথে। নীলচাষে বাধ্য বাধ্যকতার নামে বাংলাদেশীদের উপর বৃটিশ নির্যাতন এবং তুলা চাষের নামে মিসরীয়দের উপর বর্বরতা তাদের দু’জনকেই সমান ব্যথিত করে। স্বাধীনতাহীনতার জ্বালা তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন একীভূত মানসিকতায়। স্বাধীনতার লাল সূর্যের আকাঙ্ক্ষায় ছিল তাদের মিশ্রিত অনুভূতি। তাই তাদের লেখা ও কবিতা স্বাধীনতার উজ্জীবনী প্রতিনিয়ত জীবন্ত করে। স্বাধীনতার মাত্রাকে উস্কে দেয়। স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করে।

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিটি কবিতাই স্বাধীনতার মন্ত্র। শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের পক্ষে প্রতিবাদ লিপি। তার জাগরণী কবিতা, দেশাত্মবোধক কবিতা কিংবা শিশুতোষ কবিতার সর্বত্র তিনি গেয়েছেন স্বাধীনতার গান। সত্যিই তার কাব্যসম্ভার স্বাধীনতার এক বিশাল মহীরুহ। কবি নজরুলের প্রতিটি কবিতার একাধিক বা ততধিক অর্থ বিদ্যমান। শাব্দিক অর্থ, অন্তর্নিহিত অর্থ, মর্মার্থ প্রভৃতি তার প্রতিটি পঙক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কলেবর বৃদ্ধির আশংকা না থাকলে এ নিয়ে বড় আলোচনার প্রবৃত্ত হওয়া সম্ভব। আমরা সে দিকে যাব না। লক্ষ্য করুন তার একটি শিশুতোষ ছড়া :

ভোর হলো
দোর খোলো
খুকুমণি ওঠো রে!
ওই ডাকে
যুঁই শাখে
ফুল খুকি ছোট রে!

কবিতাটি কী নান্দনিকতায় ভরপুর? যেন শিল্পীর চিত্রিত শিল্পকর্ম। কত দিকেই এর অর্থ করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় এটি শিশুদের ঘুম ভাঙানোর ছড়া। কী চমৎকার! দেখুন কবি শিশুদের জাগানোর নাম করে মূলত জাগাতে চাচ্ছেন পরাধীন দেশমাতৃকাকে। কবি এখানে অত্যন্ত চতুরতার সাথে দেশকে মাতা না বলে খুকি বলে সম্মোধন করেছেন। কারণ খুকি শীঘ্রই মাতা হবেন। সেটিই স্বাভাবিক। কবির কল্পনায় আমাদের পরাধীন দেশটাও যেন খুকির মতোই নিদ্রা পাগল। ঘুম কাতুরে। পৃথিবীব্যাপী যখন স্বাধীনতার আন্দোলন তুঙ্গে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদয়োন্মুখ তখনও কি আমরা ঘুমিয়েই থাকব? সেখানেও কবি আশাবাদী। কী চমৎকার আশাবাদ তার :

খুলি হাল
তুলি পাল
ঐ তরী চললো
এই বার
এই বার
খুকু চোখ খুললো।

কবি হাফিজ ইব্রাহীম তিনিও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপোসহীন। মিসরের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলন ছিল দীর্ঘ মেয়াদী। পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে মিসরীয়দের অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। এ আন্দোলনে দানশওয়াই-এর ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মিসরের স্বাধীনতা আন্দোলনের মাইলফলক। ‘দানশওয়াই’ কবিতায় কবির সদম্ভ উচ্চারণ :

আরে সাম্রাজ্যবাদী!
করছো মোদের শাসন
বিস্মৃত হয়েছো প্রতিশ্রুতি
ভুলে গেছো হৃদ্যতা
সারা দেশে সেনা টহল
জাতির ঘুম হারাম
ফায়দা লুটো তোমরা
লুটেরাদের কী আরাম!
স্বাধীনতার কথা বলবে কে?
ঠিকানা তার কারাগার। (দিওয়ান: পৃষ্ঠা- ২৯২-২৯৩)


অনুরূপভাবে মিসরের স্বাধীনতাপ্রত্যাশী কবি হাফিজ ইব্রাহীম তার ‘অভিযোগ’ কবিতায় বলেন :
মিসর আজ পূর্ণ শোষণের যাঁতাকলে
প্রাণ ওষ্ঠাগত নির্যাতন আর নিষ্পেষণে
লোভ দেখায়- লিখে মিথ্যা ফরমান
মিসর হবে স্বাধীন, গাইবে স্বাধীনতার গান। (দিওয়ান: পৃষ্ঠা- ২৯৫)

সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশের কোনো প্রতিশ্রুতিকেই কবি বিশ্বাস করেন না। কারণ পরাশক্তি কখনও নিপীড়িতদের স্বাধীনতা কিংবা মুক্তি দেয় না। স্বাধীনতা নিজেদের আপন শক্তি বলেই অর্জন করতে হয়। পৃথিবীর ইতিহাস অন্তত তাই বলে। তাই কবিও তাদের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করেননি। বরং সেটাকে প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করে জাতিকে সতর্ক করেছেন এবং স্বাধীন থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করবার মতো যে, মিসরবাসীর স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি যে সব কবিতা লিখেছেন তা ক্রমানুসারে একত্রিত করলে রীতিমতো মহাকাব্যের মর্যাদা পাবার অধিকারী হবে। সে কথা জোর দিয়েই বলা যায়।

ঘ.

কবি নজরুল স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য কবিতা রচনা করে ক্ষান্ত হয়েছেন এমনটি নয়। বরং তিনি সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বার আহ্বান জানিয়েছেন বীরদর্পে অসংখ্য কবিতায়। তার ভাঙার গান বা বিদ্রোহী কবিতার ব্যঞ্জনা আজও বাংলাদেশীদের হৃদয়তন্ত্রীতে ঝংকৃত হয় অমৃত মূর্ছনায়। যেন আজও শোষকের টুঁটি চেপে ধরতে এ একটি কবিতাই যথেষ্ট। কবির রণ হুঙ্কার :

কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল কররে লোপাট
রক্তজমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী
কিংবা
লাথি মার ভাঙরে তালা
যতো সব বন্দীশালায়
আগুন জ্বালা
আগুন জ্বালা ফেল উপাড়ি (ভাঙার গান)

কবি কখনও আত্মস্বার্থ চিন্তায় চিন্তিত নন। তার চিন্তার সর্বত্র স্বদেশ। স্বাধীনতা। দেশমাতৃকা। মাতৃভূমির পরাধীনতায় তিনি ব্যাকুল, বিক্ষুব্ধ। তাই তিনি বিদ্রোহী। এর অবসান তার চাই-ই-চাই। কবির উচ্চারণ :

মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শান্ত।
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ ভূমে রণিবে না- (বিদ্রোহী)


কবি হাফিজ ইব্রাহীমও কম যান না। তিনি বৃটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে। তাদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন লিখনীর আঁচড়ে। আবার কখনও ধমকে দিয়েছেন নির্ভীকভাবে। ফলে নির্যাতন এসেছে তার উপরেও। সহ্য করেছেন নিশ্চুপ। কিন্তু থামিয়ে দেননি তার কবিতা। ‘বৃটিশদের প্রতি’ কবিতায় তার সাহসী উচ্চারণ :

হায় নীল! হায় মিসরের তারকা! সূর্য!
কোথায় তোমাদের সে আলো?
কোথায় তোমার প্রভাত সমীরণ?
জলে স্থলে তাদের নগ্ন পদচারণায় কলুষিত পরিবেশ
গ্রেফতার নির্যাতনে অতিষ্ঠ জনতা
ব্যাকুল স্বদেশ! (দিওয়ান: পৃষ্ঠা- ৩৫২)

এভাবেই হাফিজ ইবরাহীমের কবিতার একটি বড় অংশ শুধুই স্বাধীনতা, দেশমাতৃকা, পরাধীনতার শৃংখল মুক্তি, সাম্রাজ্যবাদের মূলোৎপাটন ইত্যাদিকে ঘিরে আবর্তিত।

যুগ-কালভেদে কিংবা স্থান-কাল বিবেচনায় পরিবেশের তারতম্য হতে পারে। তবে হর্ষ-বিষাদ বা আনন্দ-বেদনা প্রকাশের প্রক্রিয়ায় দেশ-কাল ভেদে কোনো প্রভেদ দেখা যায় না। তেমনি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বা পরাধীনতার ব্যাকুলতায়ও কোনো পার্থাক্য দেখা যায় না। তাই আমরা দু’দেশের এ দু’জাতীয় কবির কবিতায় একই সুরের অনুরণন শুনতে পাই। কারণ সাম্রাজ্যবাদীদের নির্যাতন তাদের দু’জনের কাছেই ছিল প্রচণ্ড বিরক্তির। তাদের দু’জনের কাছেই স্বাধীনতা ছিল চরম আকাঙ্ক্ষার। অত্যাচারীর খড়গ ও নির্যাতনের স্টিমরোলারই তাদের দু’জনকে কাছাকাছি করে দিয়েছে। অবশ্য স্থানীয় প্রতিবেশ, পরিবেশ ও যুগপ্রেক্ষিত এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

ঙ.

পরিবারে উচ্ছন্নে যাওয়া দুখু মিয়া জীবিকার তাগিদে দোকান কর্মচারীর পেশা গ্রহণ। অন্যদিকে বাবা-মা মরা হাফিজের মামার আশ্রয়ে লেখাপড়ার ঈষৎ প্রচেষ্টা দু’জনকেই জীবন সংগ্রামী করে তোলে। তারা দু’জনেই দেশমাতৃকার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করে। জাতি তাদের মূল্যায়নে বিভ্রান্তিতে পড়েনি। তাদের যথাযথ মর্যাদায় সিক্ত করেছে। কবিকে ধন্য করেছে। তারাও ধন্য হয়েছে। একজন কবির এর থেকে বেশী চাওয়া আর কী হতে পারে? তবে এ কথা নিশ্চয়ই করে বলা যায় না যে তাদের কোনো শত্রু নেই। তাদেরও শত্রু ছিল। সমালোচক ছিল। তাদের প্রতি পরশ্রীকাতর ছিল। অবশ্য এতে কিছু আসে যায় না। চামচিকার খোঁচা হাতিকে কতটুকু আহত করতে পারে। বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় কবির মর্যাদাকে চির সমুন্নত রাখবে। সমালোচকদের সমুচিত জবাব দিবে। দু’দেশের প্রতিবাদী এই দুই যোদ্ধার সকল সাহিত্যসৃষ্টি আরবি ও বাংলায় ভাষান্তর করলে উভয় ভাষাভাষীর কৌতূহল নিবৃত্ত হবে, এ মহান কবির আরও সাযুজ্য জানা যাবে। তাতেই সাধিত হবে উভয় জাতির মহত্তর কল্যাণ।
- দ্য রিপরট

সংবাদটি পঠিতঃ ৬৯৬ বার

ট্যাগ নিউজ

সর্বশেষ খবর